ফিরছেন রাজ্যহীন এক রাজা…

বাংলাদশে জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান
শেয়ার করুন

বাংলাদশে জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে প্রত্যাশা ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা ক্রমেই একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। আশাবাদী মহলের ধারণা-এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে যদি অন্তত ২০ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা যায়, তবে কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছাড়াই তারেক রহমান কার্যত দেশের অঘোষিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। যদিও জনমতের একটি বড় অংশ বলছে, এই উপস্থিতির সংখ্যা ৫০ লক্ষও ছাড়াতে পারে। এখানে ক্ষমতার কাগুজে বৈধতা নয়, বরং জনসমর্থনের শক্তিই হয়ে উঠছে তাঁর প্রধান ভিত্তি।

এই প্রত্যাবর্তন কেবল দীর্ঘ সময়ের নির্বাসনের অবসান নয়; এটি একটি পরিণত রাজনৈতিক নেতৃত্বের পুনরাগমন। জনদুর্ভোগ এড়াতে সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি, শৃঙ্খলার ওপর জোর, মানবিক অগ্রাধিকার এবং প্রতিশোধপরায়ণ ভাষা এড়িয়ে চলার প্রবণতা-সব মিলিয়ে তারেক রহমান ধীরে ধীরে একজন স্টেটসম্যান হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন। এখানে হুংকার নয়, বরং সময় ও জনগণের রায়ের প্রতি আস্থাই মুখ্য হয়ে উঠছে; রাজনৈতিক পরিপক্বতার এই ভাষা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

একই সময়ে দেশের রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্যও দৃশ্যমান। যারা নির্বাচন পেছানোর প্রশ্নে অস্থিরতা তৈরি করেছিল এবং ‘হাদি হত্যার বিচার না হলে নির্বাচন নয়’-এমন কঠোর অবস্থান নিয়ে রাজপথ উত্তাল করেছিল, তাদের সাম্প্রতিক আচরণ জনমনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বর্তমান ডাকসুর জিএস ফরহাদ ও এজিএসের সাম্প্রতিক বিবাহ, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু সদস্যকে বিয়ে করে ব্যক্তিগত জীবনে স্থিতির প্রকাশ, তাদের আগের আবেগী রাজনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই তুলনা টানছে। ব্যক্তিগত জীবনের স্বাভাবিক ও আনন্দঘন আয়োজনের পাশে মাত্র ১০০ ঘণ্টা আগের তীব্র রাজনৈতিক দাবির অবস্থান-এই দ্বৈততা অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘হাতের রক্ত’ আর ‘মায়াকান্না’র বয়ান বাস্তবতার আলোয় নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে। আবেগী স্লোগান ও নৈতিক উচ্চারণের ধারাবাহিকতা রাজনীতিতে যেমন জরুরি, তেমনি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সেই অবস্থানের সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ-এ কথাই জনআলোচনায় সামনে আসছে। এখানে পরিচয়ের বিভ্রান্তি নয়, বরং নেতৃত্বের দায়, ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

এই বৈপরীত্যের মাঝেই তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন আলাদা মাত্রা পাচ্ছে। ব্যক্তিগত আবেগকে সামনে না এনে তিনি সময়ের দাবি অনুযায়ী স্থির, পরিমিত ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে তিনি আজ এমন এক “রাজা”, যার হাতে এখনো আনুষ্ঠানিক “রাজ্য” নেই; কিন্তু যদি লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর পাশে দাঁড়ায়, তবে সেই জনসমর্থনই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় রাজ্য। এই প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একজন নেতার দেশে ফেরা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব, বৈধতা ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ আচরণের নতুন সংজ্ঞা তৈরির সম্ভাবনাও বহন করছে।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও সামনে আসছে। যারা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে নেমেছে, দেশে কৃত্রিম অস্থিরতার সংস্কৃতি চালু করতে মরিয়া হয়েছে, যারা প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে এবং মিথ্যা চমক ও অসত্য তথ্য দিয়ে জনমত বিভ্রান্ত করেছে-সময়ের স্রোতে তাদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে। জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও শান্তিপূর্ণ শক্তির সামনে এসব অপচেষ্টা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে-এমনটাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পরিচিতি : মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত