আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চোখে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন,বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি নতুন সমীকরণ?
দীর্ঘ সতেরো বছর নির্বাসনের পর তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার সংবাদ হয়ে থাকেনি; এটি রূপ নিয়েছে বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে এক গভীর আলোচনায়। বিবিসি, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস, আল-জাজিরা, এএফপি, ডন, দ্য হিন্দু ও এনডিটিভির প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে দেখা হয়েছে ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক কাঠামো ও সম্ভাব্য ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে।
রয়টার্স তার প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ করেছে, তারেক রহমানকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে সংবাদ সংস্থাটি মন্তব্য করেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্য এটি শুধু সাংগঠনিক পুনর্জাগরণ নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসার একটি বাস্তব সম্ভাবনার সূচনা।
বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়কে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার হিসেবে তাঁর অবস্থান আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে নতুন করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিবিসি মনে করছে, এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরোনো দুই ধারার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে, তবে এবার তা ঘটছে একটি ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
নিউইয়র্ক টাইমস তার প্রতিবেদনে বিষয়টিকে দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে, দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থাকা কোনো নেতার এমন প্রত্যাবর্তন সাধারণত কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় থাকে না; বরং তা একটি দেশের রাজনৈতিক সহনশীলতা, আইনি কাঠামো এবং ক্ষমতার রদবদলের সক্ষমতাকেও তুলে ধরে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের ফেরা সেই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
আল-জাজিরা তার প্রতিবেদনে জনসমর্থন ও রাজনৈতিক আবেগের দিকটি গুরুত্ব দিয়েছে। বিমানবন্দর ও জনসমাবেশে বিপুল সংখ্যক সমর্থকের উপস্থিতি তুলে ধরে তারা বলেছে, তারেক রহমান এখনো একটি বড় রাজনৈতিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। আল-জাজিরা একই সঙ্গে তাঁর অতীত আইনি জটিলতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও জানিয়েছে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেগুলো আর তাঁর দেশে ফেরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
এএফপি ও ডন তাদের প্রতিবেদনে আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছে। পাকিস্তানের ডন লিখেছে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের দ্য হিন্দু ও এনডিটিভি একইভাবে বিষয়টিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, সীমান্ত রাজনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট—তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে কেউই একক কোনো রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেনি। এটি তুলে ধরা হয়েছে একটি চলমান রাজনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে। কেউ কেউ এটিকে গণতান্ত্রিক পুনঃপ্রতিযোগিতার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে, আবার কেউ সতর্ক করছে পুরোনো রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কার বিষয়ে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে তারেক রহমানের দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এই প্রত্যাবর্তন কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার পথ খুলে দেবে, নাকি পুরোনো দ্বন্দ্ব নতুন রূপে ফিরে আসবে—সে উত্তর এখনো সময়ের হাতে। তবে এটুকু স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে এটি কোনো ক্ষণস্থায়ী সংবাদ নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনাবিন্দু।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি নিউজ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, আল-জাজিরা, এএফপি, ডন, দ্য হিন্দু, এনডিটিভি (ডিসেম্বর ২০২৫)।
লেখক : মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
