নির্বাচনের বাইরে মান্না: আইনের শাসন না রাজনৈতিক বাস্তবতা
মাহমুদুর রহমান মান্নার নির্বাচন করতে না পারার ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিলের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ব্যাংকিং শাসন এবং বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। ঋণখেলাপির অভিযোগে একজন রাজনৈতিক নেতার প্রার্থিতা বাতিল হওয়া আইনত অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সেই অভিযোগের পেছনের প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত ও ভূমিকার ব্যাখ্যা অস্পষ্ট থেকে যায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নীরব থাকে।
মান্নার ক্ষেত্রে যে তথ্যগুলো সামনে এসেছে, তাতে দেখা যায় তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি, কিন্তু তাঁর ব্যবসায়িক পরিচয় ও ঋণের ইতিহাস সম্পর্কে জনপরিসরে সুস্পষ্ট তথ্য কখনো আলোচনায় আসেনি। হঠাৎ করে তাঁকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা, পুনঃতফসিলের আবেদন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হেড অফিস থেকে অনুমোদন পাওয়া, আংশিক অর্থ পরিশোধের পরও লোকাল ব্রাঞ্চের মাধ্যমে ফাইল রিকল এবং আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা—এই ধারাবাহিকতা সাধারণ নাগরিকের কাছে বিভ্রান্তিকর। যদি পুনঃতফসিলের অনুমোদন সত্যিই বৈধভাবে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে একটি স্থানীয় শাখা কীভাবে সেটি কার্যত অকার্যকর করে দেয়, সে প্রশ্নের উত্তর ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির ওপর আঙুল তোলে।
আরও গভীর প্রশ্ন তৈরি করে আদালতের ভূমিকা নিয়ে মান্নার বক্তব্য। দুপুরে একটি আদেশ এবং সন্ধ্যায় সেই আদেশ স্থগিত—আইনগতভাবে এটি সম্ভব হলেও, কেন এমন হলো, কোন যুক্তিতে হলো এবং কেন রাষ্ট্রপক্ষ বা সরকারি আইনজীবীরা এমন একটি মামলায় সক্রিয়ভাবে অবস্থান নিলেন, যেখানে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ নয়—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার ব্যাখ্যা না থাকলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিচারালয় নিয়ে মান্নার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন। এটি যদি সত্য না-ও হয়, তবু এমন অভিযোগ জনসমক্ষে উচ্চারিত হওয়া নিজেই রাষ্ট্রের জন্য একটি অস্বস্তিকর সংকেত।
এই পুরো ঘটনায় আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়—রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে একটি কোম্পানির অন্য পরিচালকরা দেশে না থাকলে বা কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে না পারলে, সব দায় একা একজনের ঘাড়ে চাপছে। করপোরেট শাসনের দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনি জটিলতা মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ব্যক্তি অপরাধী না হয়েও কাঠামোগত সমস্যার শিকার হন। একই সময়ে যখন হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপিদের পুনঃতফসিল সহজেই অনুমোদিত হয় বলে অভিযোগ শোনা যায়, তখন তুলনামূলকভাবে ছোট অঙ্কের ঋণ নিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রয়োগ জনমনে বৈষম্যের ধারণা জোরদার করে।
এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনীতির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের জন্য প্রথম ও প্রধান নীতি হওয়া উচিত ব্যাংকিং ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। ঋণ পুনঃতফসিল, খেলাপি নির্ধারণ এবং সিআইবি রিপোর্টের মতো বিষয়গুলোতে স্পষ্ট নিয়ম, সময়সীমা ও লিখিত ব্যাখ্যার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে, যাতে ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটার সুযোগ না থাকে। আদালতের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও ব্যাখ্যাযোগ্যতা বাড়াতে হবে, যাতে আদেশ পরিবর্তনের কারণ জনসমক্ষে বোধগম্য হয় এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ জন্ম না নেয়।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হবে নীতিগত ও আদর্শিক, প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মাধ্যমে নয়। মাহমুদুর রহমান মান্নার নির্বাচন করতে না পারা যদি সত্যিই আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগের ফল হয়, তবে সেই আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর যদি এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাজ করে থাকে, তবে সেটি শুধরে নেওয়াই হবে ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি সংস্কার। কারণ ন্যায়বিচার ও সমান আইনি আচরণের ওপর মানুষের আস্থা হারালে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন প্রার্থী নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
লেখক: মো: হাফিজ আল আসাদ , রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
