“খালেদা জিয়া: ইতিহাসে লেখা এক নাম”
বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও নারীর নেতৃত্বের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর দীর্ঘ জীবন ছিল সংগ্রাম, নেতৃত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার এক বিস্তৃত ক্যানভাস। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি ধারার নাম এবং কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক।
খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা শুরু হয় আশির দশকের শুরুতে, কিন্তু তাঁর জীবনদর্শন, ধৈর্য ও নেতৃত্বের প্রস্তুতি গড়ে ওঠে অনেক আগেই। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রেক্ষাপটে তিনি সামনে আসেন এক অনিবার্য নেতৃত্ব হিসেবে। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দ্রুতই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নির্বাচন ছিল সামরিক শাসন-পরবর্তী প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করে। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর-এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন তাঁর শাসনামলের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়।
তিনি মোট তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন-১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে পূর্ণাঙ্গভাবে এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী সরকারের নেতৃত্বে। এই সময়গুলোতে তাঁর সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ বিস্তার এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের দিকে গুরুত্ব দেয়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন খাতের যাত্রা, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে তাঁর সরকারের নীতিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নারী নেতৃত্ব ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে তিনি একাধিকবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক পরিসরে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর সময়কালে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নারী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ নারীদের সামাজিক দৃশ্যমানতা বাড়াতে বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়িত হয়। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনে গুরুত্ব দেন। বিএনপিকে তিনি একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলে রূপ দেন, যার সাংগঠনিক কাঠামো দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থেকেও তিনি সংসদীয় রাজনীতি, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্নে দলের অবস্থান দৃঢ় রাখেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথে সক্রিয় ছিল বহু বছর।
খালেদা জিয়ার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল তাঁর কারাবাস ও অসুস্থতার সময়কাল। দীর্ঘ সময় বন্দিজীবন এবং পরে গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থেকে গেছেন। তাঁর এই সময়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সহনশীলতা, ধৈর্য ও ব্যক্তিগত দৃঢ়তার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি দলীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সক্রিয় ছিলেন, যা তাঁকে অনুসারীদের কাছে আরও দৃঢ় ও অনমনীয় নেতৃত্বের প্রতীক করে তোলে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কমনওয়েলথ, ওআইসি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার “টু বেগম” রাজনীতির এক কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন—যেখানে নারী নেতৃত্ব দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবস্থান বহু গবেষণা ও আলোচনার বিষয় হয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সামাজিক সহানুভূতি, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবিক মূল্যবোধের কথা বারবার উচ্চারণ করেছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সংকটে সহমর্মিতা প্রকাশ এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে সংবেদনশীলতা তাঁকে একজন মানবিক রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি টানল। তাঁর জীবন ছিল উত্থান-পতন, ক্ষমতা ও সংগ্রাম, দায়িত্ব ও ধৈর্যের সমন্বয়। তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেতৃত্বের এক শক্ত প্রতীক হিসেবে। সময়ের সঙ্গে তাঁর অর্জনগুলো আরও গভীরভাবে মূল্যায়িত হবে, গবেষণায় আসবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
মো: হাফিজ আল আসাদ ,সাবেক ছাত্র নেতা। যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক
এক্স জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
