নির্বাচনের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনই রাষ্ট্রের একমাত্র জবাব
শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে তীব্রভাবে সামনে এসেছে, তা হলো—রাষ্ট্র কি প্রকাশ্য হুমকি, বলপ্রয়োগ ও ভয় দেখানোর রাজনীতির কাছে নতি স্বীকার করবে, নাকি আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ় অবস্থান নেবে? একজন রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের পরিচয়ধারী ব্যক্তি থানার ভেতরে দাঁড়িয়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে সহিংস ঘটনার উল্লেখ করে হুমকি দিলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ থাকে না; তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের করণীয় প্রথমত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হতে হবে। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, দল বা আন্দোলনের অতীত অবদানের ভিত্তিতে কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। কেউ যদি নিজেকে “আন্দোলনের নেতা” পরিচয় দিয়ে সহিংসতার স্মৃতি বা দাবি ব্যবহার করে প্রশাসনকে ভয় দেখায়, তবে রাষ্ট্রকে তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দিতে হবে যে নাগরিকের অধিকার যেমন সুরক্ষিত, তেমনি অপরাধের দায়ও এড়ানোর সুযোগ নেই। অন্যথায় ভবিষ্যতে যে কেউ নিজ নিজ রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থানায় ঢুকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব এখানে আরও সংবেদনশীল। থানার ভেতরে হুমকিমূলক বক্তব্য, পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে চাপের মুখে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। পুলিশকে অভ্যন্তরীণভাবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে এবং ভিডিওসহ সব প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট সমর্থন প্রয়োজন। থানার ভেতরেই যদি পুলিশ আত্মবিশ্বাস হারায়, তবে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
আইন ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্যে দেওয়া এমন বক্তব্য ফৌজদারি আইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন, সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা প্রদান এবং সহিংসতায় উসকানির আওতায় পড়তে পারে। একজন সিনিয়র আইনজীবীর মতে, ভবিষ্যতে মামলা হলে এই বক্তব্যই স্বীকারোক্তিমূলক প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের আইনি মূল্যায়নই বিচারব্যবস্থার একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত। দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া চালু হলে একদিকে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নির্দোষ কেউ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হয় সেটিও নিশ্চিত করা যাবে।
এই ঘটনাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে আসন্ন নির্বাচন। সামনে নির্বাচনকে ঘিরে যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চায়, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার সুযোগ খুঁজবে—এটাই বাস্তবতা। এ ক্ষেত্রে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। যারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে, তাদের সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, গণমাধ্যম—সবার দায়িত্ব হলো উসকানিমূলক বক্তব্য ও শক্তির প্রদর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং আইনের পক্ষে কথা বলা। কারণ নির্বাচন বানচাল করার অপচেষ্টা যদি সামাজিকভাবে প্রতিহত না হয়, তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জনমনে সৃষ্ট আতঙ্ক দূর করা। থানার ভেতরে হুমকি, সহিংসতার উল্লেখ এবং পুলিশের অসহায় অবস্থান যদি সাধারণ মানুষ দেখে, তবে তারা নিরাপত্তা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া—দুটো নিয়েই শঙ্কিত হয়ে পড়ে। প্রশাসনকে প্রকাশ্যে ও কার্যকরভাবে জানাতে হবে যে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইনের বাইরে কেউ নয়। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর আত্মসমালোচনাও জরুরি—কারণ আন্দোলনের নৈতিক শক্তি আসে শৃঙ্খলা, সংযম ও দায়িত্ববোধ থেকে, ভয় দেখানো বা দাপট দেখানো থেকে নয়।
শেষ পর্যন্ত এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিবর্তন ও নির্বাচন সুরক্ষিত হয় আইন, ন্যায় ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে; আগুন, হুমকি বা অতীত সহিংসতার স্মৃতি দেখিয়ে নয়। আজ যদি এই ভাষা ও আচরণ উপেক্ষিত হয়, কাল তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই এখনই সময়—রাষ্ট্র, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বার্তা দিক: নির্বাচন ও আইনের শাসনের কোনো বিকল্প নেই।
মোঃ হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
