বৈষম্যবিরোধী সেই ছাত্রনেতা গ্রেফতার
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলার সদস্য সচিব মাহদী হাসানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাত পৌনে ৮টার দিকে তাকে হবিগঞ্জ শহর থেকে গ্রেফতার করে শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশ।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম। তিনি বলেন, রাত পৌনে ৮টায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
চব্বিশের আন্দোলনের সময় হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানায় আগুন দেওয়ার ঘটনায় মাহদী হাসানের একটি বক্তব্য শুক্রবার বিকালে ভাইরাল হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেফতারের পর শায়েস্তাগঞ্জ থানা থেকে তাকে ছাড়াতে গিয়ে এ বক্তব্য দেন মাহদী। বক্তব্যের ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেছেন।
ভিডিওতে তাকে বলতে দেখা যায়, আন্দোলনের সময় আমরা বানিয়াচং থানা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। এসআই সন্তোষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।
এ ঘটনায় শনিবার নিজের ফেসবুকে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহদী হাসান। সেখানে তিনি বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এক ভাইকে গ্রেফতারের ঘটনায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তার একটি বক্তব্য স্লিপ অব টাং হয়েছে; যা ছড়িয়ে দেশবাসীর কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে।
তিনি লেখেন- আমি মূলত ওই থানায় গিয়েছিলাম আমার একজন জুলাই সহযোদ্ধা ভাইকে বাঁচানোর জন্য। মূলত আন্দোলনে তার ভূমিকার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ আমি প্রশাসনের কাছে পাঠানোর পরও তারা তাকে ছাড়তে টালবাহানা করে। একপর্যায়ে আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। কারণ তখন আমার একটি জিনিসই মনে হয়েছে যে ছেলেটি আমার সঙ্গে থেকে আন্দোলন করেছে, ফাইট করেছে তার সঙ্গে এভাবে অন্যায় করা হচ্ছে। এটি অন্তত আমি মেনে নিতে পারিনি।
তিনি আরও লেখেন- আমি মূলত বুঝাতে চেয়েছিলাম যে আমরা জুলাইযোদ্ধারা হবিগঞ্জের শান্তিপ্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি স্থাপনাগুলো অক্ষত রাখার ভূমিকা পালন করেছি। আমি এবং আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা মিলে ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট বিজয় মিছিল চলাকালে জানতে পারি যে বানিয়াচংয়ে আমাদের ৯ জন ভাইকে গুলিতে হত্যা করা হয়েছে।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালামকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন- আপনাকে বলতে হবে, আমার ভাইকে কেন গ্রেফতার করা হলো। আপনি বলেছেন আন্দোলনকারী তো কী হয়েছে? সে তো ডেভিল। এখানে আমার ১৭ জন ভাই শহীদ হয়েছেন। আপনি কেন বলেছেন, ও ডেভিল ছিল। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানে গর্ভনমেন্ট ফরম করেছি। আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আমাদের ছেলেদের গ্রেফতার করেছেন। আবার বার্গেডিং করছেন এবং বলছেন আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে। দেশের যে কয়েকটি জায়গায় শক্তিশালী আন্দোলন হয়েছে, এর মধ্যে হবিগঞ্জ একটি। আন্দোলনে অংশ নেওয়া নেতাদের ডেভিল আখ্যা দিয়ে আপনারা গ্রেফতার করছেন।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম বলেন, ছাত্রলীগের কমিটিতে নাম থাকায় নয়নকে আটক করা হয়েছিল। তবে আন্দোলনে অংশগ্রহণের তথ্যপ্রমাণ পাওয়ায় পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্লেকার্ডসহ ছবিও আছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসান বলেন, ছাত্রলীগের কমিটিতে নাম থাকলেও স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে নয়ন সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। আমার সঙ্গেই তিনি আন্দোলন করেছেন। এমন অসংখ্য ছবি ভিডিও আছে। তারপরও তাকে আটকের ঘটনায় আমরা মর্মাহত হয়েছি।
তিনি বলেন, ইতোপূর্বে আমাদের আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরও ৩ জনকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে আটক করা হয়। এর মধ্যে একজন এখনো জেলে আটক আছেন। এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা কষ্ট লেগেছে। আর তেমন কিছুই নয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে নিষিদ্ধ ঘোষিত উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হাসান নয়ন নামে এক তরুণকে বৃহস্পতিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আটক করে পুলিশ। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমন ছবি ভিডিও তাৎক্ষণিক পুলিশ কর্মকর্তদের কাছে পাঠান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। কোনো সাড়া না পেয়ে তারা শুক্রবার দুপুর থেকে তার মুক্তির দাবিতে শায়েস্তাগঞ্জ থানার সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে মাহদী হাসান শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে যান। তখন একপর্যায়ে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি ওসিকে উদ্দেশ্য করে উল্লেখিত কথা বলেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ৫ আগস্ট বানিয়াচংয়ে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে ৯ জন শহীদ হন। পরে উত্তেজিত জনতা বানিয়াচং থানা জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় নিহত হন বানিয়াচং থানার এসআই সন্তোষ।
