ডনরো মতবাদের বৈশ্বিক প্রতিধ্বনি: এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে সম্ভাব্য প্রভাব

শেয়ার করুন

ডনরো মতবাদ মূলত মনরো মতবাদের আধুনিক ও আক্রমণাত্মক পুনর্গঠন, যার কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা। যদিও এটি সরাসরি লাতিন আমেরিকাকে লক্ষ্য করে গঠিত, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও আচরণ পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সেই প্রেক্ষাপটে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে এই মতবাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বিশ্লেষণ করা জরুরি।

এশিয়ায় ডনরো মতবাদের প্রভাব প্রধানত একটি দৃষ্টান্তমূলক চরিত্র বহন করবে। পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে তারা নিজস্ব প্রভাব বলয়ে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উপস্থিতি সহ্য করবে না, তাহলে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে একই ধরনের নীতি আরও দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করতে উৎসাহিত হতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি কিংবা কোরীয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ও সামরিকভাবে দৃশ্যমান হতে পারে, যাতে মিত্রদের আশ্বস্ত করা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বৈশ্বিক নেতৃত্বে অনড়। একই সঙ্গে এশিয়ার ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে, যা আঞ্চলিক ভারসাম্যকে আরও নাজুক করে তুলবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ডনরো মতবাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে পরোক্ষ হলেও গভীর। পশ্চিম গোলার্ধে একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণকে আরও স্বার্থকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে, যেখানে গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের ভাষা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব পাবে। তেল, জ্বালানি নিরাপত্তা, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং ইরানের প্রভাব ঠেকানো—এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আরও নির্বাচনী হস্তক্ষেপের পথে হাঁটবে। এর ফলে কিছু মিত্র রাষ্ট্র বাড়তি সমর্থন পেলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক প্রভাব কমে যেতে পারে এবং রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক শূন্যতা পূরণের সুযোগ বাড়তে পারে।

ইউরোপে ডনরো মতবাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্তরে অনুভূত হতে পারে। এই মতবাদ যুক্তরাষ্ট্রের “আমেরিকা ফার্স্ট” দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্ট করে, যা ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে নিরাপত্তা নির্ভরতার প্রশ্ন নতুন করে উত্থাপন করবে। ন্যাটোর ভবিষ্যৎ, ইউক্রেন সংকট বা রাশিয়ার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে—এই অনিশ্চয়তা ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি পশ্চিম গোলার্ধে মনোযোগ আরও কেন্দ্রীভূত করে, তবে ইউরোপে তার কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পৃক্ততা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে ডনরো মতবাদ শুধু একটি আঞ্চলিক নীতি নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকার পুনঃসংজ্ঞা। পশ্চিম গোলার্ধে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের এই আকাঙ্ক্ষা বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বলয়ের ধারণাকে আবারও সামনে নিয়ে আসে, যা ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী বহুপাক্ষিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আরও প্রতিযোগিতামূলক, অঞ্চলভিত্তিক ও সংঘাতপ্রবণ হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়, যার প্রতিধ্বনি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ—তিন অঞ্চলেই ভিন্ন ভিন্ন রূপে অনুভূত হতে পারে।

লেখক: মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রচার সম্পাদক ইতিহাস এলামনাই এসোসিয়েশন (CUHADA)।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত