জামায়াতের রাজনীতি: ১৯৮৬ থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচন

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক নাটকীয়। জামায়াত-এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত-তার ইতিহাসও বেশ উত্থান-পতনের।
১৯৮৬–১৯৮৮: এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের ছায়া সঙ্গী হয়ে জামায়াত ১০টি আসনে জয়ী হয়, কিন্তু ভোটের মাঠে অনেক সমস্যা ছিল—ভোটারদের চাপ, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাধা, এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচন আরও সমস্যাপূর্ণ ছিল। অনেক দল বয়কট করেছিল, তাই জামায়াতের জয় বা ফলাফল সেই সময়ের নির্বাচনের বাস্তব জনপ্রিয়তা বোঝায় না, কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে তাদের উপস্থিতি দেখায়।

১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পর দেশে পুরোপুরি স্বাধীন গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয়। জামায়াত তখন প্রথমবারের মতো পুরো নির্বাচনী মাঠে অংশ নেয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তারা ১৮টি আসনে জয়ী হয়। যদিও সংখ্যা কম, এই জয় তাদের জন্য রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের মুহূর্ত। নেতারা প্রচারণায় আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন, ভোটারদের কাছে শক্তিশালী ইমেজ তৈরি করেছিলেন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত নেতা গোলাম আজম ঘোষণা দেন-“ধানের শীষের দিন শেষ, জামায়াতের বাংলাদেশ।” প্রচারণা খুবই শক্তিশালী, নেতা ও সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। কিন্তু ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর মাত্র ৩টি আসনে জয়, এবং ২২০-এর বেশি আসনে তারা জামানত হারায়। এই ফলাফল দেখায়, শব্দে শক্তি দেখানো গেলেও জনগণের বিশ্বাস ছাড়া ভোটে জয় অসম্ভব।

২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জামায়াত কিছুটা সফল হয়। তারা ৩০টি আসনে প্রার্থী দেয় এবং ১৭টি আসনে জয়ী হয়। এটি তাদের জন্য আংশিক পুনর্জাগরণের সুযোগ, কিন্তু দল এখনো স্বাধীন শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠেনি।

২০০৮ সালের নির্বাচন জামায়াতের জন্য বড় হতাশার। ভোটে প্রভাব কম, নেতাদের প্রচারণা জনমতের উপর প্রভাব ফেলতে পারেনি। ২০১৪–২০১৮ সাল পর্যন্ত তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উপস্থিতি সীমিত। নতুন প্রার্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি, পুরনো নেতারা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

২০২৫–২০২৬: নতুন লাইফ থ্রিলারে এবার জামায়াত ঘোষণা করেছে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮০ প্রার্থী। অনেক প্রার্থী স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে পরিচিত নয়, করোনার সময় জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি। বিদেশ থেকে আনা নেতারা ভোটের মাঠে আসে, কিন্তু নির্বাচন শেষে চলে যাবে। দলের প্রচারণা ও হুমবুমি এখনও রোমাঞ্চ তৈরি করতে পারে, কিন্তু জনগণের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাস ও প্রত্যাশার সংযোগ না থাকায় ফলাফল খুবই অনিশ্চিত।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-১৩তম জাতীয় নির্বাচন। প্রতিটি ভোট কেন্দ্র, ভোটার এবং প্রার্থী যেন একটি লাইভ নাটকের অংশ। জামায়াতের পুরনো হুমবুমি, নতুন অচেনা প্রার্থীরা এবং ভোটারদের উত্তেজনা-সব মিলিয়ে এটি হবে একটি সত্যিকারের রাজনৈতিক থ্রিলার।

সারসংক্ষেপে জামায়াত সবসময় প্রচারণা ও হুমবুমির মাধ্যমে বড় দেখাতে চেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের ভোটে শক্তি সীমিত। জনগণের বিশ্বাস ছাড়া কোনো হুমবুমি ফলপ্রসূ হয় না। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও তাদের একই চ্যালেঞ্জ-শব্দের শক্তি বনাম জনগণের বাস্তব সমর্থন।

এখন প্রশ্ন : এই লাইফ থ্রিলারের শেষে জামায়াত কি নতুন শক্তি হিসেবে ফিরে আসবে, নাকি আবার ইতিহাসের ছায়া খেলোয়াড় হয়ে থাকবে?

মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত