নারীর সম্মতি কি ঐচ্ছিক? দ্বিতীয় বিবাহ, ব্যক্তিগত আইন ও পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র

শেয়ার করুন

বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিবাহ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক হাইকোর্ট রায়টি কেবল একটি আইনি ব্যাখ্যা নয়; এটি নারীকে রাষ্ট্র, পরিবার ও আইনের চোখে কীভাবে দেখা হয়-তার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। এই রায় নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্নটি সামনে এনে দিয়েছে: নারীর সম্মতি কি একটি মৌলিক অধিকার, নাকি তা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ভেতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে?

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ প্রণয়নের পেছনে যে সংস্কারমূলক দর্শন কাজ করেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণ ও প্রথম স্ত্রীর সুরক্ষা। সেই আইনের ৬ নম্বর ধারা দ্বিতীয় বিবাহকে স্বামীর একক সিদ্ধান্ত থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় নজরদারির আওতায় আনে। বাস্তব প্রয়োগে এই নজরদারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ভিত্তি ছিল-স্ত্রীর সম্মতি। এটি কেবল একটি কাগুজে অনুমতি নয়, বরং নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও পারিবারিক স্থিতির স্বীকৃতি ছিল।

সাম্প্রতিক রায়ে আদালত বলেছেন, মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর অনুমতির কথা সরাসরি উল্লেখ নেই; বরং আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতিই আইনসম্মত শর্ত। এই ব্যাখ্যা আইনের পাঠের দিক থেকে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও, নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গভীরভাবে সমস্যাজনক। কারণ এতে নারীকে একটি স্বতন্ত্র অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং পুরুষের বিবাহ সিদ্ধান্তের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়।

প্রশ্ন হলো-আরবিট্রেশন কাউন্সিল কি বাস্তবে নারীর কণ্ঠস্বরের বিকল্প হতে পারে? স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পুরুষতান্ত্রিক বাস্তবতায়, যেখানে নারীর বক্তব্য প্রায়ই সামাজিক চাপ, পারিবারিক ভয় ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক না থাকলে দ্বিতীয় বিবাহ কার্যত পুরুষের ক্ষমতার আইনি বৈধতায় পরিণত হয়।


বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করেছে শুধু নীতিগতভাবে নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবেও। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে এবং ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ নারীর ও পরিবারের সুরক্ষাকে রাষ্ট্রের কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই সাংবিধানিক বাস্তবতার আলোকে ব্যক্তিগত আইনের ব্যাখ্যা যদি নারীর সম্মতিকে ঐচ্ছিক করে তোলে, তবে তা সংবিধানসম্মত কি না-সে প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

রিটকারীরা যে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন, তা কেবল একটি রায়ের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিক্রিয়া নয়; এটি নারীর অধিকারকে প্রশাসনিক অনুমতির নিচে নামিয়ে আনার বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রতিবাদ। তাঁদের যুক্তি স্পষ্ট-ব্যক্তিগত আইন যদি নারীর সম্মতি ছাড়া পুরুষের বহুবিবাহকে কার্যত সহজ করে দেয়, তবে সেই আইন সংস্কারযোগ্য, প্রশ্নাতীত নয়।


এই বিতর্ক আমাদের আরও একটি মৌলিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: ব্যক্তিগত আইন নিরপেক্ষ নয়। এটি সমাজের বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোর প্রতিফলন। যখন আদালত আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কেবল পাঠগত নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে, তখন সেই ব্যাখ্যা অজান্তেই পিতৃতান্ত্রিক বাস্তবতাকে পুনরুৎপাদন করতে পারে। নারীবাদী আইনচিন্তা এই কারণেই বলে—আইনের পাঠ নয়, আইনের প্রভাবই হওয়া উচিত বিচারিক বিশ্লেষণের কেন্দ্র।
অতএব প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, দ্বিতীয় বিবাহ আইনি কি না।

প্রকৃত প্রশ্ন হলো-এই আইনি কাঠামো কি নারীকে পূর্ণ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, নাকি তাকে এমন এক নীরব সত্তায় পরিণত করে, যার জীবনঘনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিয়ে নেয়? যতদিন স্ত্রীর সম্মতি আইনের কেন্দ্রে না আসে, ততদিন বহুবিবাহ নিয়ে যে কোনো “আইনসম্মত” ব্যাখ্যা নারীর অধিকারকে দুর্বলই করবে।

এই রায় হয়তো আইনের পাঠকে মেনে চলে, কিন্তু নারীর ন্যায্যতার প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আদালত, সংসদ এবং সমাজ-তিনকেই পিতৃতান্ত্রিক স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এসে নতুন করে ভাবতে হবে।

মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত