এআই যুগে টিকে থাকতে হলে ডিগ্রির পাশাপাশি স্কিল বাধ্যতামূলক: চ্যান্সেলর আবু বকর হানিপ

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোটে জন্ম নেওয়া আবু বকর হানিপের শিক্ষাজীবন কেটেছে চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে আইবিএম, ওরাকল, আইআরএস, আমেরিকান ডিফেন্সসহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মাধ্যমে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন বৈশ্বিক চাকরির বাজার কীভাবে কাজ করে, কোথায় দক্ষতার ঘাটতি, আর কোথায় সুযোগ।

এই অভিজ্ঞতাই তার চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে। তিনি উপলব্ধি করেন—শুধু একাডেমিক ডিগ্রি থাকলেই চাকরি নিশ্চিত হয় না। বাস্তব দক্ষতা না থাকলে চাকরি পাওয়া কঠিন, আর চাকরি পেলেও টিকে থাকা আরও কঠিন। এই বাস্তবতা থেকেই তিনি প্রথমে প্রতিষ্ঠা করেন পিপলএনটেক—একটি সম্পূর্ণ স্কিল-ফোকাসড ট্রেনিং ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম।

গত প্রায় দুই দশকে পিপলএনটেক-এর মাধ্যমে তিনি ১০,০০০-এর বেশি বাংলাদেশিকে আমেরিকার মেইনস্ট্রিম কর্পোরেট জগতে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। তারা সফটওয়্যার, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা, ক্লাউড, নেটওয়ার্কিংসহ উচ্চচাহিদাসম্পন্ন খাতে কাজ করছেন এবং প্রত্যেকেই বছরে এক লক্ষ মার্কিন ডলারের বেশি আয় করছেন। এটি কোনো গল্প নয়, এটি বাস্তব ফলাফল—যা প্রমাণ করে সঠিক স্কিল থাকলে বাংলাদেশিরা বৈশ্বিক চাকরির বাজারে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

তবে একটি প্রশ্ন তাকে থামতে দেয়নি—এই স্কিলগুলো কেন ডিগ্রির পরে শেখাতে হবে? কেন একাডেমিক শিক্ষার মধ্যেই এই দক্ষতা গড়ে তোলা হবে না?

এই প্রশ্নের উত্তর থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (WUST)। WUST প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল একাডেমিক ডিগ্রির সাথে স্কিল ডেভেলপমেন্টকে একীভূত করা—যাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেই বাস্তব চাকরির জন্য প্রস্তুত থাকে।

২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত WUST আজ কাজ করছে একটি স্পষ্ট ও সময়োপযোগী দর্শনের ওপর—ট্রিপল মিশন: ডিগ্রি, স্কিল, ক্যারিয়ার। এখানে শিক্ষা মানে শুধু সার্টিফিকেট বা গ্রেড নয়। শিক্ষা মানে এমন মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা সরাসরি মিড-লেভেল পজিশনে কাজ করার সক্ষমতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো WUST-এর ফ্যাকাল্টি মডেল। এখানে সব ফ্যাকাল্টি মেম্বারই স্কলার এবং প্র্যাকটিশনার—যাদের ইন্ডাস্ট্রি অভিজ্ঞতা ৪ বছর থেকে শুরু করে ৩০ বছর পর্যন্ত। তারা শুধু বইয়ের তত্ত্ব শেখান না; তারা শেখান বাস্তব সমস্যা, বাস্তব টুলস, এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা। এর ফলে ক্লাসরুম ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যকার যে বড় ফাঁকটি রয়েছে, WUST সেখানে কার্যকরভাবে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।

সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টকশোতে আলোচনাকালে আবু বকর হানিপ নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্ক বার্তা দেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে এন্ট্রি-লেভেল চাকরি দ্রুত কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে AI ইতোমধ্যেই এসব কাজ করছে, এবং খুব শিগগিরই মিড-লেভেল চাকরিতেও এর প্রভাব আরও গভীর হবে। এই বাস্তবতায় “শুধু ডিগ্রি” দিয়ে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করা একটি বড় নীতিগত ভুল।

তিনি গত ২০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন—স্কিল ডেভেলপমেন্ট একাডেমিক শিক্ষার বিকল্প নয়, এটি একাডেমিক কারিকুলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে। স্কিল শেখা কোনো আলাদা বা ঐচ্ছিক ট্রেনিং নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের ভেতরেই থাকতে হবে। কারিকুলাম যদি আপডেট না হয়, আর ফ্যাকাল্টি যদি ইন্ডাস্ট্রির সাথে সংযুক্ত না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের চাকরির জন্য প্রস্তুত হয় না।

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি প্রসঙ্গে তিনি নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী প্রস্তাব তুলে ধরেন। তার মতে, যদি বাংলাদেশ অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দেশেই দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠাতে পারে, তাহলে বর্তমান রেমিটেন্সের পরিমাণ কমপক্ষে তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব। এমনকি বাংলাদেশ সরকার চাইলে গন্তব্য দেশগুলোতে হট স্কিলভিত্তিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করতে পারে—সেই দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলের তত্ত্বাবধানে। এতে একদিকে দক্ষতা আরও বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান হবে শক্ত ও সম্মানজনক।

এই নীতিগত কাঠামো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু শ্রম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদের বৈশ্বিক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর সুফল পাবে সরকার, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—সবাই।

প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রসঙ্গে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির চ্যান্সেলর আবু বকর হানিপ বলেন, প্রবাসী হওয়া মানে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। বরং প্রবাসীরাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দেশের উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে পারে। ভোটাধিকার নিশ্চিত হলে পরবর্তী প্রজন্মও বাংলাদেশের সাথে যুক্ত থাকবে; অন্যথায় তারা ধীরে ধীরে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

দিনশেষে আবু বকর হানিপ একজন সফল উদ্যোক্তা। কিন্তু তার প্রকৃত পরিচয় সেখানে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ ডিগ্রির পাশাপাশি স্কিল অর্জন করে সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়ছে। তার বার্তা পরিষ্কার—AI আমাদের শত্রু নয়, কিন্তু AI-এর যুগে টিকে থাকতে হলে মানুষকে আরও দক্ষ, আরও প্রস্তুত হতে হবে।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত