ক্ষমতার অদৃশ্য যুদ্ধ: নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টায় কারা, প্রতিরোধে কে?

শেয়ার করুন

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখনো দক্ষিণ এশিয়ার একটি কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া তুলনামূলকভাবে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা ও নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক স্থিতাবস্থাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বার্তা বহন করে। একটি বিতর্কিত বা বিলম্বিত নির্বাচন আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে উপমহাদেশজুড়ে শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত “ডিপ স্টেট” একটি একক সত্তা নয়; বরং এটি বিভক্ত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, একাংশ নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কৌশলের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই” এই যুক্তিকে সামনে এনে নির্বাচন বয়কট ও রাজপথে অচলাবস্থার পরিকল্পনা রয়েছে। জামায়াত-এনসিপির সম্ভাব্য এই অবস্থান ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবেই বিশ্লেষিত হচ্ছে। কারণ তারা ভালো করেই জানে, একটি অবাধ নির্বাচনে বিএনপির ক্লিন মেজরিটি পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। সুতরাং নির্বাচন ভেস্তে গেলে বা পিছোলে ক্ষমতার ভারসাম্যে তাদের দরকষাকষির সুযোগ থেকে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতীক বরাদ্দের ঠিক আগমুহূর্তে নির্বাচন পেছানোর কথা ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়; বরং এটি বৃহত্তর একটি কৌশলগত ন্যারেটিভের অংশ বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। একই সঙ্গে লক্ষ্যণীয়, ডিপ স্টেটের আরেকটি অংশ স্পষ্টতই নির্বাচনমুখী। এই অংশটি চায় একটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক এবং আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এড়ানো যাক। এই বাস্তবতা থেকেই চরমোনাইকে বড় পরিসরে নির্বাচনে নামতে “ম্যানেজ” করার চেষ্টা এবং জাতীয় পার্টির ২৫০-এর বেশি আসনে প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে আসছে। এর মাধ্যমে একটি বিকল্প বিরোধী শক্তির কাঠামো প্রস্তুত রাখা হচ্ছে, যেন কোনো পক্ষ নির্বাচনী প্রক্রিয়া বানচাল করার চেষ্টা করলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি না হয়।

এই সব গোপন ও প্রকাশ্য মুভমেন্টের মধ্যেই তারেক রহমান ও সালাউদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন তাৎপর্য পায়। “গণতন্ত্র নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র চলছে”—এই ভাষা নিছক রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং চলমান ঘটনাপ্রবাহের সরাসরি প্রতিফলন। বিশেষ করে ডক্টর শফিকুরের ইনিয়ে-বিনিয়ে জাতীয় সরকারের ইঙ্গিত যখন তারেক রহমান স্পষ্টভাবে নাকচ করেন, তখন থেকেই এই ষড়যন্ত্রের ফাইনাল স্টেজ কার্যত দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এই অবস্থান ক্ষমতার শরিক হওয়ার লোভকে প্রত্যাখ্যান করে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করে।

এখানেই তারেক রহমানের ভূমিকা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে আসে। তিনি ক্রমাগতভাবে নিজেকে এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে স্থাপন করেছেন, যেখানে ক্ষমতার শর্টকাট বা আপস নয়, বরং নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের রায় নেওয়াই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। এই অবস্থান অবিকল তার মায়ের রাজনৈতিক চরিত্রের প্রতিচ্ছবি—গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীনতা, চাপের মুখে নত না হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বৈধতাকে তাৎক্ষণিক সুবিধার চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া। জামায়াত-এনসিপি বা অন্য যেকোনো শক্তি যতই হাকডাক করুক, তারেক রহমানের রাজনীতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকার ভয় দেখিয়ে গণতন্ত্রকে জিম্মি করা যাবে না।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ এমন এক টার্ময়েল পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে নির্বাচন হবে কি হবে না—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কোন পথে হাঁটবে। একটি পথ ক্ষমতার কৌশলী পুনর্বিন্যাস ও অস্থায়ী বন্দোবস্তের, অন্যটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধার। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান আজ কেবল একটি দলের নেতা নন, বরং চলমান রাজনৈতিক ট্রানজিশনে গণতন্ত্রের প্রতীকী মুখ হিসেবেই আবির্ভূত হচ্ছেন।

মো: হাফিজ আল আসাদ ,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত