পলিসি সামিট থেকে রাষ্ট্রদর্শন: বিএনপি বনাম জামায়াত-৩১টু ৩১দফা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট–২০২৬’ নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক রাজনীতিতে একটি নীতিকেন্দ্রিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইসিটি, তরুণ উন্নয়ন ও রেমিট্যান্স—প্রায় সব খাতকে ছুঁয়ে যাওয়া এই ঘোষিত রূপরেখা দেখায় যে দলটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামো হাজির করতে চায়। তবে জাতীয় রাজনীতির বাস্তবতায় এই রূপরেখাকে একা দাঁড়িয়ে নয়, বরং বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা ও ৮ দফার বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তার প্রেক্ষাপটে বিচার করাই বেশি প্রাসঙ্গিক।
বিএনপির ৩১ দফা মূলত একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নকশা। এখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। এই জায়গাগুলোতে জামায়াতের ঘোষিত নীতির সঙ্গে মৌলিক মিল রয়েছে। উভয় দলই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আইসিটি ও রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির কথা বলছে। অর্থাৎ সমস্যার চিহ্নিতকরণে একটি সাধারণ জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিফলন দেখা যায়।
কিন্তু পার্থক্যটি ধরা যায় গভীরতা বিশ্লেষণে। জামায়াতের পরিকল্পনা তুলনামূলকভাবে প্রোগ্রামভিত্তিক ও সংখ্যামুখী—কত জনকে ঋণ, কত শতাংশ ট্যাক্স, কত লাখ চাকরি। অন্যদিকে বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রের কাঠামো ঠিক না হলে কোনো নীতিই টেকসই হবে না—এই রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিএনপির নীতিচিন্তা বেশি প্রাতিষ্ঠানিক এবং দীর্ঘমেয়াদি।
এখানেই বিএনপির ঘোষিত ৮ দফা একটি আলাদা মাত্রা যোগ করে। কৃষিকার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ কেবল সামাজিক সহায়তা নয়; বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিক ও পরিবারের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস। কৃষিকার্ড ধারণা কৃষিকে ভর্তুকিনির্ভর খাত নয়, বরং তথ্যভিত্তিক, উৎপাদনমুখী ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়। ফ্যামিলি কার্ড আবার সামাজিক নিরাপত্তাকে ব্যক্তি নয়, পরিবারকেন্দ্রিক করে—যা বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জামায়াতের প্রস্তাবিত স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ডের সঙ্গে মিল থাকলেও, বিএনপির ধারণা এখানে আরও বেশি সামাজিক কাঠামো ও গ্রামীণ বাস্তবতায় প্রোথিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রচিন্তা এখনো প্রকাশিত হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বিশ্বের বহু রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক চিন্তকের অভিজ্ঞতা থেকে আহরিত। যদি তা প্রকাশ পায়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা আইসিটির বাইরেও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, ক্ষমতার ভারসাম্য, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, নগর-গ্রাম বৈষম্য হ্রাস এবং নাগরিক অধিকারের সাংবিধানিক নিশ্চয়তার মতো বিষয় সেখানে আরও স্পষ্টভাবে আসতে পারে—যেগুলো জামায়াতের ঘোষিত রূপরেখার বাইরে গিয়ে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার অতিরিক্ত দিকনির্দেশনা দেবে।
বাস্তবতার প্রশ্নে দেখা যায়, জামায়াতের অনেক প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও রাজনৈতিক ঐকমত্য অপরিহার্য। এই ভিত্তিগুলো ছাড়া ট্যাক্স কমানো, সুদমুক্ত ঋণ বা বিশাল কর্মসংস্থান পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। বিএনপির ৩১ দফা ঠিক এই ভিত্তিটিই আগে তৈরি করার কথা বলে—যেন নীতি কেবল ঘোষণা নয়, কার্যকর রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য হয়।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে তাই বলা যায়, জামায়াতের ‘পলিসি সামিট–২০২৬’ নীতিগত আলোচনায় একটি দৃশ্যমান ষ্ষ্ট্রাকচার রয়েছে। কিন্তু বিএনপির ৩১ দফা ও ৮ দফা, এবং তারেক রহমানের অপ্রকাশিত বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তা মিলিয়ে যে বিস্তৃত রাজনৈতিক দর্শন তৈরি হচ্ছে, তা কেবল কর্মসূচির তালিকা নয়—বরং একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক ও টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের রূপরেখা হিসেবে সামনে আসার সম্ভাবনাই বেশি। রাজনীতির ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা তাই কে কত ঘোষণা দিল, সে প্রশ্নে নয়; বরং কে রাষ্ট্র চালানোর গভীর ও বাস্তবসম্মত চিন্তা দিতে পারছে—সেই বিচারেই নির্ধারিত হবে।
মো: হাফিজ-আল-আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
