‘দেশ এখন নতুন ধারার ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের মধ্যে আছে’: অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ

শেয়ার করুন

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক’ (ইউএপি)-এর দুই শিক্ষক লায়েকা বশীর ও ড. সায়েম মোহসীনকে বিধি-বহির্ভূতভাবে চাকুরিচ্যুত করার প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংগঠনটি মনে করে, এই ঘটনা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির এবং বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার (একাডেমিক ফ্রিডম) ওপর চরম আঘাত।

আজ বুধবার, ২১ জানুয়ারি দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ক্ষোভ ও দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যটি পালাক্রমে পাঠ করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তানভীর সোবহান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মীর্জা তাসলিমা সুলতানা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা এবং অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ।

সংবাদ সম্মেলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, “দেশ এখন নতুন ধারার ফ্যাসিবাদী অগ্রাসনের মধ্যে আছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বাকস্বাধীনতার প্রত্যাশা করেছিলাম, তা আজ হুমকির মুখে। একটি গোষ্ঠী ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং ‘মব’ তৈরি করে ভিন্নমত দমনে লিপ্ত হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের কাছে নতি স্বীকার করছে।”

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে লায়েকা বশীর ও ড. সায়েম মোহসীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে আসছিলেন, তাকেই সুপরিকল্পিতভাবে ‘ধর্মানুভূতি’র দোহাই দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে লায়েকা বশীরের ক্ষেত্রে অভিযোগ জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই এবং কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাঁকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ড. সায়েম মোহসীনকে কোনো তদন্ত ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক তকমা দিয়ে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানে এই দুই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পক্ষে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। অথচ প্রশাসনের ভেতরের একটি অংশ এবং কতিপয় দখলবাজ গোষ্ঠী তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এই মব ইনজাস্টিসকে উসকে দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর মহাপরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উপস্থিত থেকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকাশ করেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজলী শেহরীন ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডঃ কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্যামলী শীল, বুয়েটের শিক্ষক ড. সায়েম মাহমুদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৌভিক জয়দেব এবং আইনজীবী মানজুর মতিন প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলন থেকে ৪ দফা দাবি পেশ করা হয়: ১. অবিলম্বে লায়েকা বশীর ও ড. সায়েম মোহসীনকে স্ব-পদে পুনর্বহাল করা। ২. তদন্তের নামে শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধ করা এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। ৩. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মজীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন। ৪. উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিন্তার স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা সমুন্নত রাখা।

বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি এই ‘মব কালচার’ বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা বিশ্বদরবারে বড় ধরণের আস্থার সংকটে পড়বে। বর্তমানে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। যা একজন শিক্ষকের অধিকার।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত