সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৪২ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ছাত্র সমাবেশ ও মিছিল

শেয়ার করুন

ছাত্র রাজনীতির আদর্শবাদী – বিপ্লবী ধারাকে শক্তিশালী করা,শিক্ষা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার আহবান জানিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৪২ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ছাত্র সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ বুধবার, বেলা ১২ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট।

বিকাল ৪.৩০ টায় সেগুনবাগিচাস্ত ২৩/২ তোপখানা রোড়ে বাসদ ভবনের ছাঁদে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকাস্থ বর্তমান ও সাবেক দের নিয়ে পুন মিলনী অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশ সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ। আরও বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সুহাইল আহমেদ শুভ,দপ্তর সম্পাদক অনিক কুমার দাস,প্রচার প্রকাশনা সম্পাদক হারুন উর রশিদ।

সমাবেশে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগর এর সভাপতি কানেজ চাকমা। সভা পরিচালনা করেন সমজাতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, সেক্যুলার, বৈষম্যহীন, একই পদ্ধতির গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে ছাত্র ফ্রন্টের পথচলা শুরু হয়েছিল। আজ ২১ জানুয়ারি ‘২৬ ছাত্র সমাজের অধিকার আদায়ের লড়াকু সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে সংগঠনের প্রাক্তন-বর্তমান সকল নেতা-কর্মী, সমর্থক- শুভানুধ্যায়ী, শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকসহ দেশের সকল স্তরের মানুষকে জানাই সংগ্রামী সালাম ও আন্তরিক অভিবাদন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগী মানুষের সমর্থন সহযোগিতায় সংগঠনের বিকাশের ধারা অব্যাহত রয়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, ছাত্রসমাজসহ এই ভূখণ্ডের জনগণ বারে বারে শিক্ষা ও গণতন্ত্রের দাবিতে রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ‘৫২ এর ভাষার দাবি, ‘৬২ এর শিক্ষার অধিকার, ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ‘৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। ভৌগোলিকভাবে স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিকই কিন্তু দেশের মানুষের অর্থনৈতিকসহ সার্বিক মুক্তি আজও আসেনি।

স্বাধীন বাংলাদেশে শাসক ধনিক শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে দেশীয় লুটেরা ধনিক শ্রেণি এবং বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লুটপাটের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত করেছে। তার বিরুদ্ধেও বারবার মানুষ সংগ্রাম গড়ে তুলেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়ে ‘৯০-এ সামরিক স্বৈরাচারী শাসক এরশাদকে পরাস্ত করেছে। ২০২৪ এ আওয়ামী স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জীবন দিয়েছে এদেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা।

২০২৪ এর ৫ আগস্টে গণ অভ্যুত্থানের পর ইতিমধ্যে ১৭ মাস অতিবাহিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের; কিন্তু জনগণের যে অভূতপূর্ব সমর্থন ও প্রত্যাশা সরকারের প্রতি ছিল সেটিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে পতিত হাসিনা সরকারের মতোই দেশি-বিদেশি লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, শ্রমিক-কৃষকের অধিকারহীনতা তো বেড়েছেই শুধু নয়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, মব-সন্ত্রাস, লুটতরাজ, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকসহ ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাংচুর, পাহাড়-সমতলের আদিবাসীদের জাতিগত নিপীড়ন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন, মাজার-মন্দির ভাংচুর, বাউলদের উপর নিপীড়ন বেড়েই চলেছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে দেশের চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে একের পর এক বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোপন চুক্তি সম্পাদন করে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকে ইস্যু করে দেশের প্রথিতযশা সংবাদপত্র প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ ছায়ানট, উদীচী অফিসে হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা ভয়ানকভাবে রহস্যজনক।

একইভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে রাস্তায় সম্ভাব্য একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীকে হত্যা, কথিত ধর্ম অবমাননার অজুহাতে ভালুকায় শ্রমিক দিপু দাসকে পিটিয়ে মেরে পুড়িয়ে দেয়ার মতো বীভৎস ঘটনা ঘটেছে। কোথাও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। এই রকম পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা রয়েছে।

এই নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের যেমন ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, সকলের জন্য ভোটের সমান সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরস্থিতির উন্নতি হয়নি। ফলে রয়েছে ভীতি ও অনশ্চিয়তা।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, বছরের শুরুতেই প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুলের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করার ঘোষণা থাকলেও গত বছর ২০২৫ সালে মার্চ মাস পেরিয়ে গেলেও সকল শিক্ষার্থী বই হাতে পায়নি। এবারেও আমরা দেখলাম মাধ্যমিক স্তরের বই সংকট বিদ্যমান। স্কুল শিক্ষার অবহেলা দীর্ঘ দিনের। সরকারি স্কুল ও কলেজের সংখ্যা অপ্রতুল। প্রাথমিকে গান ও খেলাধুলার শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তকমা দিয়ে একদল শিক্ষা নিয়ে করছে রমরমা ব্যবসা।

মাধ্যমিক শিক্ষার জাতীয়করণের দাবি থাকলেও বারবার অবহেলায় পূরণ হচ্ছে না সেই দাবি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ ক্রমাগত কমছে। ঢাকার সরকারি সাত কলেজের সংকট সমাধানের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেই,অধ্যাদেশ নিয়ে চলছে তালবাহানা। বর্তমান সরকার কথায় কথায় শিক্ষার্থীরাই তার ম্যান্ডেট দাতা বলতে বলতেই শিক্ষার বেসরকারিকরণ-বাণিজ্যিকীকরণের রাস্তায় হাটছে। ফলত ডজনখানেক কমিশন হলেও শিক্ষা সংস্কার কমিশন হয়নি। অথচ প্রধান উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতন- ফি নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ছে না। শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাস-দখলদারিত্বমুক্ত গণতান্ত্রিক শিক্ষার পরিবেশ নির্মাণ করে ছাত্র সংসদের জন্য দীর্ঘ লড়াই করে আসছে।

সম্প্রতি ডাকসু, রাকসু, জাকসু, চকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোনটিই অবাধ-গ্রহণযোগ্য, প্রশ্নহীন বলে বিবেচিত হয়নি। প্রশাসন ছাত্র রাজনীতি বন্ধের চক্রান্ত করে গুপ্ত সন্ত্রাসীদের জায়গা করে দিয়েছে। যার প্রভাব নির্বাচিত ছাত্র সংসদগুলোতে পড়েছে। এটি ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন,আগামীদিনে একদিকে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ-বেসরকারিকরণ, সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে যেমন লড়তে হবে, তেমনিভাবে শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনির্মাণের সংগ্রামে ছাত্র সমাজকে ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সংগ্রামে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট দেশের সকল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত