সিলেটে তারেক রহমানের বক্তব্য ও জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর প্রথম জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা একটি নির্বাচনী বক্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান। এই বক্তব্যের পরপরই জামায়াত-ই-ইসলামীর প্রতিক্রিয়া এবং তাদের ব্যবহৃত নেগেটিভ ভাষা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তারেক রহমানের বক্তব্যে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও জনগণের ক্ষমতার প্রশ্নটি কেন্দ্রীয়ভাবে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং ভোটাধিকার হরণের অভিজ্ঞতার পর তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। এই অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই সেই রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, যাদের রাজনীতি গণতান্ত্রিক কাঠামোর চেয়ে আদর্শিক আধিপত্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, নির্বাচনী প্রচারে ‘জান্নাতের টিকিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে তিনি শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই বক্তব্য ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় ও সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে। এতে ধর্মীয় আবেগকে ভোটের পুঁজি হিসেবে ব্যবহারকারী রাজনীতির বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জামায়াতের প্রতিক্রিয়া মূলত এই আদর্শিক চ্যালেঞ্জেরই বহিঃপ্রকাশ।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বিতর্কিত ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াও জামায়াতের জন্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এই জায়গায় অবস্থান দুর্বল হলে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ইতিহাসের এই অধ্যায় পুনরায় উচ্চারিত হওয়ায় জামায়াতের নেগেটিভ ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার আশ্চর্যের নয়।

জামায়াতের এই নেগেটিভ ভাষা কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। প্রথমত, তারা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কা অনুভব করছে। দ্বিতীয়ত, নিজেদের সমর্থকদের ধরে রাখতে তারা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও আক্রমণাত্মক ভাষার আশ্রয় নিচ্ছে। তৃতীয়ত, নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে অনাস্থা সৃষ্টি করে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি প্রচ্ছন্ন কৌশলও এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, তারেক রহমানের বক্তব্য একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়—যেখানে ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় থাকবে, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে গণতান্ত্রিক নীতিমালা ও জনগণের রায়ের ভিত্তিতে। এই দ্বন্দ্বই মূলত বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক পার্থক্যকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—নির্বাচনকে ঘিরে বিভাজন নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা। ধর্মীয় আবেগ, ইতিহাস বিকৃতি বা নেগেটিভ প্রচারণা নয়; জনগণের প্রকৃত সমস্যার সমাধান ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সকল রাজনৈতিক শক্তির প্রধান লক্ষ্য।

সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে বলা যায়, তারেক রহমানের বক্তব্যে যে রাজনৈতিক স্পষ্টতা ও আদর্শিক সীমারেখা টানা হয়েছে, তা আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। জামায়াতের প্রতিক্রিয়া সেই পরিবর্তনের চাপই প্রতিফলিত করছে—যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত