চেয়ার নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দায়িত্বহীন সিদ্ধান্তের মূল্য

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা সাধারণত আকস্মিক বলে মনে হলেও বাস্তবে তা দীর্ঘদিনের আচরণ ও সংস্কৃতির ফল। এসব ঘটনা একদিনে ঘটে না; ধাপে ধাপে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে মতপার্থক্য স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া না থেকে শারীরিক সংঘর্ষের দিকে ধাবিত হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়।

মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে সভা বা সমাবেশ অনেক সময় আদর্শ বিনিময়ের জায়গা থাকে না। বরং এটি হয়ে ওঠে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র। কে আগে এসেছে, কার লোকসংখ্যা বেশি, কারা সামনে অবস্থান করছে—এই দৃশ্যমান বিষয়গুলো থেকেই ক্ষমতার হিসাব কষা হয়। এমন বাস্তবতায় বসার চেয়ার, রাস্তা বা অবস্থান প্রতীকী গুরুত্ব পায়। এগুলো হারানো বা ছাড় দেওয়া অনেকের কাছে রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে ধরা দেয়।

এই মানসিকতা থেকেই সংঘাতের বীজ জন্ম নেয়। যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা পারস্পরিক সহাবস্থানের সীমা অতিক্রম করে, তখন প্রতিপক্ষ আর ভিন্নমতাবলম্বী থাকে না; সে হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বী, কখনো শত্রু। এতে করে সামান্য ঘটনাও বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
বর্তমান সময়ে অনলাইন রাজনৈতিক পরিবেশ এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরাম বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য, হুমকি ও অবমাননাকর ভাষা বাস্তব রাজনীতিতে সহনশীলতা কমিয়ে দিয়েছে। ভার্চুয়াল পরিসরে যে আগ্রাসী ভাষা সহজে ব্যবহার করা যায়, বাস্তবে মুখোমুখি হলে তার প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব উপস্থিত থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ অনুপস্থিত থাকে। ঘোষণার মাধ্যমে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হলেও মাঠের কর্মীদের আচরণ সব সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। উত্তেজিত পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের নির্দেশ অকার্যকর হয়ে পড়া একটি গুরুতর সাংগঠনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভূমিকা এখানেও প্রশ্নের মুখে পড়ে। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রকাশ্যে নিরাপত্তা দিতে অক্ষমতার কথা জানায়, তখন সেটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে একদিকে নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, অন্যদিকে সহিংস আচরণ উৎসাহ পায়। রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির এই দুর্বলতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক।

অনেক সময় যুক্তি দেওয়া হয়, অবৈধ বাধা বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নাগরিক অধিকার। সেটি সত্য। তবে সব পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের ধরন একরকম হতে পারে না। কোথাও নীতিগত অবস্থান জরুরি, আবার কোথাও সংঘর্ষ এড়ানোই বৃহত্তর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। অনিবার্য নয় এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
সহিংসতার পরিণতি খুব স্পষ্ট। একটি প্রাণহানি কেবল একটি ব্যক্তির ক্ষতি নয়; তা একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতি এবং রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এসব ঘটনায় সাধারণত দায় নির্ধারণ হয় না, বা দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার সুযোগ তৈরি হয়।

যারা অস্ত্র নিয়ে সহিংসতায় জড়ায়, তারা কোনো রাজনৈতিক আদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এই ধরনের আচরণকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও সহিংসতার পথ খুলে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও ক্ষতিকর হয়।

রাজনৈতিক বিরোধিতার একটি সুস্পষ্ট সীমা থাকা প্রয়োজন। মতভিন্নতা গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু সহিংসতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজনৈতিক দলগুলো যদি মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা, সংযম ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর ফল ভোগ করতে হয় সমাজকেই।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—রাজনীতি কি মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য, নাকি ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি মাধ্যম মাত্র? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কমবে, নাকি আরও বাড়বে।

মো: হাফিজ আল আসাদ ,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত