যারা অপকর্ম করছে, তাদের হাতে জনগণ নিরাপদ নয় জনসভায় জামায়াত আমির
নোয়াখালীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, নোয়াখালীবাসী বিভাগ চায়, সিটি করপোরেশন চায়। আমরা ক্ষমতায় গেলে ইনসাফের মাধ্যমে আপনাদের এই প্রাণের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব।
শুক্রবার দুপুরে নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নোয়াখালীর উন্নয়নে ছয়টি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নোয়াখালী বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের দাবির পাশাপাশি হাতিয়া-কোম্পানীগঞ্জ-সুবর্ণচর নদীভাঙন
রোধে কার্যকর পদক্ষেপ, কোম্পানীগঞ্জ-ছোট ফেনী নদীতে ক্লোজার নির্মাণ এবং সোনাপুর থেকে হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাট পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হবে। ২০১৮ সালে একটি প্রতীকে ভোট দেওয়ার অপরাধে এক মায়ের ওপর পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছিল। আমরা নির্বাচিত হলে ওই মায়ের সম্মানে সুবর্ণচরে পৌরসভা করব।
জামায়াতের আমির বলেন, ‘ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যাদের কাছে মানুষ নিরাপদ না, যারা চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়েছে, তারা ক্ষমতায় আসার পর তাদের কাছে জনগণ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। দেশের যুবসমাজ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জুলাই চেতনা কাদের দ্বারা বাস্তবায়ন হবে। আমরা চাই না সাড়ে ১৫ বছরের সেই দুঃশাসন আবার বাংলাদেশে ফিরে আসুক। এ কারণে ১২ তারিখ দুইটা ভোট হবে। প্রথম ভোটটা হলো সংস্কারের পক্ষে হ্যাঁ ভোট। হ্যাঁ মানে আজাদি, না মানে গোলামি।’
নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, অনেকে বলেন জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে মা-বোনদের ঘরের বাইরে বের হতে দেবে না। আমাদের মা-বোন আছে না? তারা সব করছে না? তারা যদি উচ্চশিক্ষা নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারে, যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, তাহলে দেশের মা-বোনদেরও আমরা সেভাবে গড়ে তুলব। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।
তিনি বলেন, ‘যারা এ কথাগুলো ছড়ায় তারা বুঝে গিয়েছে মায়েরা কোন দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা মায়েদের-বোনদের কথা দিচ্ছি, আল্লাহ যদি আপনাদের ভোটের মাধ্যমে, ভালোবাসার মাধ্যমে দেশসেবার দায়িত্ব আমাদের হাতে তুলে দেন, আমাদের সব যোগ্যতা উজাড় করে আপনাদের আস্থার প্রতিদান দেব। আমাদের মায়েরা-বোনেরা সেদিন ঘরে ও কর্মস্থলে শতভাগ নিরাপত্তা উপভোগ করবেন।’
জেলা জামায়েতের আমির ও নোয়াখালী-৪ (সুবর্ণচর ও সদরের একাংশ) আসনের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ইসহাক খন্দকারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা জামায়াত সেক্রেটারি মাওলানা বোরহান উদ্দিন, ১১ দলীয় জোট নেতা ও নোয়াখালী-৬ আসনের প্রার্থী এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ প্রমুখ।
গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় কুমিল্লা নগরীর টাউন হল মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, কুমিল্লা নামেই বিভাগ হবে। যেহেতু ঘোষণা দিয়েছি, এটা পবিত্র দায়িত্ব। অন্য কেউ যদি সরকার গঠনও করে, এটা আমরা করাতে বাধ্য করব। দেশে চারটা বিভাগ ছিল, বেড়ে বেড়ে আটটা হয়েছে, দশটা হবে, বারোটা হবে, কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন হতে হবে।
কুমিল্লার সবগুলো দাবি যুক্তিসংগত উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর দাবি করা হয়েছে। এখানে একটা ইপিজেড আছে। আমি বিশ্বাস করি, ইপিজেডকে যদি আন্তর্জাতিক মানের রূপান্তর করা যায়, তাহলে বিমানবন্দরটাকেও সচল রাখা যাবে। আমরা কথা দিচ্ছি, কোনো এলাকাকে অযৌক্তিক কারণে বঞ্চিত করব না।
প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা কোনো দলের প্রতি আনুকূল্য করবেন না। দেশের মানুষের পক্ষে থাকুন।
কুমিল্লা-৬ আসনের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদের সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ প্রমুখ।
এর আগে সন্ধ্যায় কুমিল্লার লাকসাম স্টেডিয়ামে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, একটি দলের পক্ষ থেকে ঘরে ঘরে কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে, নাম তার ফ্যামিলি কার্ড। কোনো জায়গায় এটার মূল্য দুই হাজার, কোনো জায়গায় সাত হাজার, কোনো জায়গায় ২০ হাজার। আর কোনো জায়গায় বলা হচ্ছে আমরা ৫০ লাখ দেব, কোনো জায়গায় বলা হচ্ছে ৫০ কোটি দেব। এক দিকে ফ্যামিলি কার্ড, আরেক দিকে মায়ের গায়ে হাত; বাংলাদেশের মানুষকে এত বোকা মনে করেছেন?
দেশে মাঠে-ঘাটে-হাটে সর্বত্র চাঁদাবাজি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে চাঁদাবাজির কারণে রাস্তার ভিক্ষুক থেকে শিল্পপতি পর্যন্ত সবার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তোমরা মানুষের অভিশাপের পাত্র হয়ে গেছ। তওবা করে এ পথ থেকে ফিরে আসো। এই দেশকে এখনও সভ্য বলা যাবে না। যে দেশে মাঠে-ঘাটে-হাটে সর্বত্র চাঁদাবাজি হয়, সেই দেশকে কেউ সভ্য বলবে না।
কুমিল্লা-৯ আসনের জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ একেএম সরওয়ার উদ্দিন সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য দেন দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রমুখ।
বিকেলে লক্ষ্মীপুরের আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, যাদের কারণে জেল থেকে মুক্তি, যাদের কারণে অনেকে দেশে ফিরেছেন, যাদের কারণে নির্বাচনে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন, আজ তাদেরই অস্বীকার করছেন, লজ্জা-লজ্জা।
যুবকদের উদ্দেশ্য করে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা তোমাদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দেব না। বেকার ভাতা দিয়ে তোমাদের অপমানিত করতে চাই না। তোমাদের হাতগুলোকে দক্ষ কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলব। প্রত্যেকের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেব। সেদিন প্রত্যেক যুবক ও তরুণী নিজের দিকে ইশারা করে বলবে, আমিই বাংলাদেশ, দেশ আমার, এই দেশকে আমি উজাড় করে সেবা দিয়ে যাব।
জেলা জামায়াতের আমির রুহুল আমিন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য দেন লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি আতিকুর রহমান, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম প্রমুখ।
এর আগে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, একটি মহল প্রচার করছে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে ইসলামী শিক্ষা ধরে রেখেছে তারাই। কওমি মাদ্রাসা আমাদের কলিজা। আমরা কথা নয়, কাজে প্রমাণ করব। ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্যই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। জামায়াতে ইসলামীর নয়, এবার ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।
ফেনী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে জনসভায় দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান ও ফেনী-২ সদর আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রমুখ বক্তব্য দেন।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা)
