নির্বাচনের আগেই জাতির মনস্তত্ত্বের লড়াই
বাংলাদেশে নির্বাচন একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি সামাজিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয়—সে নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষা করতে সক্ষম কিনা। ভোটারকে নিশ্চিত করতে হয়—সে ভয় ছাড়াই কেন্দ্রে যেতে পারবে কিনা। আর রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখাতে হয়—তারা ফলাফল মেনে নেওয়ার মতো আস্থা রাখে কিনা।
এবারের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেছেন, “নির্বাচন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই”, “সুন্দর নির্বাচন করার সক্ষমতা আমাদের আছে”, এবং “ভোটে বাধা দিলে সেনাবাহিনী অ্যাকশন নেবে”। এই কথাগুলো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য নয়; সেনা প্রধানের দৃঢ় বার্তা। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া —বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না।
স্বাভাবিকভাবেই এই আশ্বাস অনেকের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে সেনাবাহিনীকে সাধারণত একটি পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক বিতর্কে যখন পুলিশ বা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি মানুষকে মানসিক নিরাপত্তা দেয়। ভোটকেন্দ্রে টহল, দৃশ্যমান নিরাপত্তা ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা—এসব ভোটারকে সাহস জোগায়। সহিংসতা, কেন্দ্র দখল কিংবা সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেকাংশে কমে আসার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
এই দিক থেকে সেনাপ্রধানের আশ্বাস নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা। এটি নির্বাচনের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তবুও কি জাতির শঙ্কা কেটে গেছে?
বাস্তবতা বলছে, পুরোপুরি নয়। কারণ আস্থা তৈরি হয় অভিজ্ঞতায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যা ভোটারদের মনে সন্দেহের ছাপ ফেলেছে। ভোটকেন্দ্রে বাধা, রাতের ভোটের অভিযোগ, বিরোধীদের অংশগ্রহণ সংকট, প্রশাসনিক পক্ষপাতের বিতর্ক—এসব অভিজ্ঞতা মানুষের মনে সহজে মুছে যায় না। ফলে এখন মানুষ শুধু শুনতে চায় না যে নির্বাচন “হবে”; তারা দেখতে চায় নির্বাচন “কেমন হলো”। এখানেই মূল দ্বন্দ্ব।
সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে, কিন্তু নির্বাচন পরিচালনা করে না। তারা কেন্দ্র পাহারা দিতে পারে, কিন্তু ভোটার তালিকা ঠিক করে না। তারা সন্ত্রাস দমন করতে পারে, কিন্তু ভোট গণনা বা ফলাফল ঘোষণা নিয়ন্ত্রণ করে না। অর্থাৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একার পক্ষে সম্ভব নয়।
যদি ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, যদি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ থাকে, যদি ফলাফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা না থাকে—তাহলে বাহিনীর উপস্থিতিও মানুষের শঙ্কা পুরোপুরি দূর করতে পারে না। তখন নির্বাচন নিরাপদ হলেও গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাস আসে যখন ভোটার দেখে—সে স্বাধীনভাবে ভোট দিয়েছে, কেউ বাধা দেয়নি, এবং ফলাফল নিয়ে বড় বিতর্ক ওঠেনি। নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে সহায়ক শক্তি; কিন্তু মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির।
বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে সেনাপ্রধানের আশ্বাস—যা সম্ভাবনার বার্তা দেয়। অন্যদিকে অতীত অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা—যা শঙ্কা তৈরি করে। এই দুইয়ের লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে শুধু বাহিনীর শক্তি নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কতোটা সফল হবে, তা নির্ধারণ করবে একটি সরল প্রশ্নের উত্তর—মানুষ কি ভয় ছাড়া ভোট দিতে পেরেছে, এবং ফলাফল কি সবাই বিশ্বাস করেছে? যদি পারে, তবে সেনাপ্রধানের আশ্বাস বাস্তবতায় রূপ নেবে। যদি না পারে, তবে আশ্বাস কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে—যেখানে শক্তির চেয়ে বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। সেনা প্রধানের সেই আশ্বাসে আমরা ভোট কেন্দ্র যাবো বলে আশা রাখি।
মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
