নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া): ক্যাম্পেইন কন্ট্রোল, ভোট বিভাজন ও শেষ সপ্তাহের সমীকরণ

শেয়ার করুন

নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে এবারের নির্বাচন কেবল জনপ্রিয়তার লড়াই নয়—এটি কার্যত একটি ক্যাম্পেইন ম্যানেজমেন্ট ও ভোট বিভাজনের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। মাঠপর্যায়ের চলমান কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান শামীম বর্তমানে সবচেয়ে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রচারণা পরিচালনা করছেন।
শামীমের ক্যাম্পেইনের মূল শক্তি তিন স্তরে বিস্তৃত—কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সংযোগ, ইউনিয়নভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো এবং ধারাবাহিক গ্রাউন্ড এনগেজমেন্ট। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতা চাকসু এজিএস এবং বর্তমানে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় দলীয় নেটওয়ার্কের প্রায় প্রতিটি স্তরেই তার সরাসরি প্রভাব রয়েছে। এর ফল হিসেবে হাতিয়ার অধিকাংশ ইউনিয়নে একইসঙ্গে উঠান বৈঠক, কর্মী সমাবেশ ও ভোটার সংযোগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে—যা অন্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সমানভাবে দেখা যাচ্ছে না।

স্ট্র্যাটেজিকভাবে শামীমের ক্যাম্পেইন উন্নয়ন এজেন্ডাকে সামনে রেখে সাজানো। নদীভাঙন রোধ, ব্লকবাঁধ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পর্যটন—এই পাঁচটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তার বার্তা বারবার পুনরাবৃত্ত হচ্ছে, যা ভোটারদের কাছে একটি স্পষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি করছে। পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যাশাও ধানের শীষের প্রচারণাকে একটি জাতীয় রাজনৈতিক আবহের সঙ্গে যুক্ত করছে।

অন্যদিকে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ মূলত ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও পূর্বের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে ভিত্তি করে প্রচারণা চালাচ্ছেন। নদীভাঙন ইস্যুতে তার সক্রিয়তা এবং সরাসরি ভোটার যোগাযোগ তাকে একটি স্থিতিশীল সমর্থন বলয় দিয়েছে। তবে তার ক্যাম্পেইনে কেন্দ্রীয় সমন্বয় ও ইউনিয়নভিত্তিক সংগঠনের ঘাটতি স্পষ্ট—ফলে তিনি কিছু এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও পুরো আসনে সমান গতি আনতে পারছেন না।
এই আসনের আরেকটি বড় কৌশলগত বাস্তবতা হলো ভোট বিভাজন। স্বতন্ত্র প্রার্থী তানভীর উদ্দিন রাজীব এবং মোহাম্মদ ফজলুল আজিম নিজ নিজ বলয়ে প্রভাব রাখছেন, তবে তাদের উপস্থিতি মূলত বিএনপির বাইরের ভোটগুলোকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বিরোধী ভোট এককেন্দ্রিক না হয়ে বহুমুখী হয়ে পড়ছে, যা ধানের শীষের জন্য স্বাভাবিকভাবেই সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করছে।

হাতিয়ার ভোটাররা ঐতিহ্যগতভাবে ব্যক্তি মূল্যায়ন করলেও এবারের নির্বাচনে সাংগঠনিক উপস্থিতি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। বিএনপির কর্মী কাঠামো বর্তমানে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সক্রিয়। বাড়ি-বাড়ি যোগাযোগ, কেন্দ্রভিত্তিক টিম গঠন এবং ভোটের দিনের প্রস্তুতি—এই তিনটি স্তরেই ধানের শীষ এগিয়ে রয়েছে বলে মাঠের চিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান ক্যাম্পেইন রিডিং বলছে, নোয়াখালী-৬ আসনে নিয়ন্ত্রিত মাঠ, সুসংগঠিত বার্তা এবং ভোট বিভাজনের বাস্তবতায় মাহবুবুর রহমান শামীম কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। আবদুল হান্নান মাসউদ দ্বিতীয় সারিতে থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে শেষ মুহূর্তে বড় কোনো রাজনৈতিক মোড় না এলে বিদ্যমান সমীকরণ বদলানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাতিয়ার মতো এলাকায় শেষ সপ্তাহের ভোটার উপস্থিতি ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনাই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে। সেই প্রস্তুতিতেও ধানের শীষ শিবির বর্তমানে একধাপ এগিয়ে—এটাই মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

মো: হাফিজ আল আসাদ , রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত