বিএনপির ইশতেহার: বাস্তবায়নের রোডম্যাপই হবে আসল পরীক্ষা
বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার সামগ্রিকভাবে একটি “রাষ্ট্র পুনর্গঠন”মুখী প্রক্রিয়া—যেখানে রাজনৈতিক সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন এবং নৈতিক শাসনের প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে রয়েছে। জনবান্ধবতার বিচারে এটি প্রায় ৭০ শতাংশ ইতিবাচক বলা যায়, কারণ এখানে মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—“সবার আগে বাংলাদেশ” দর্শনের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনের কেন্দ্রে আনার ঘোষণা। ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা, নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে ইশতেহারটিতে। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার, মতপ্রকাশ ও জবাবদিহিতা সংকুচিত থাকার বাস্তবতায় এই অংশগুলো জনমনে আস্থা তৈরির বড় উপাদান হতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, পেশাভিত্তিক কার্ড, ভাতা বৃদ্ধি, পেনশন ফান্ড, প্রতিবন্ধী ও এতিম শিশুদের জন্য বিশেষ তহবিল—এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বাস্তব অর্থে স্বস্তি আসতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের নামে ফ্যামিলি কার্ড, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ঘোষণা—নারীদের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়, যা ইতিবাচক।
অর্থনৈতিক অংশে অলিগার্কিক কাঠামো ভাঙার কথা, বিনিয়োগমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর, ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্টার্টআপ ও এসএমই খাতে সহায়তা, ব্যাংক সংস্কার, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা—এসব লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও দিকনির্দেশনায় আধুনিক। বিশেষ তদন্ত কমিশন, রিয়েল-টাইম অডিট, উন্মুক্ত দরপত্র ও পারফরম্যান্স অডিটের মতো টেকনিক্যাল প্রস্তাব ইশতেহারকে কেবল রাজনৈতিক নয়, কিছুটা নীতিনির্ভরতার রূপ দিয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স”, অর্থপাচার রোধ ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার, ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন এবং জাতীয় রিকনসিলিয়েশন কমিশনের ধারণা—সব মিলিয়ে অতীতের ক্ষত সারিয়ে সামনে এগোনোর একটি রূপরেখা দেখা যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আন্দোলনের শহীদদের স্বীকৃতি এবং পুনর্বাসনের বিষয়টি তরুণ প্রজন্মের আবেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।
তবে ঘাটতিও আছে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—বাস্তবায়নের সময়সীমা, বাজেট উৎস এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে স্পষ্ট রোডম্যাপের অভাব। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, ১০ লাখ আইসিটি চাকরি, বিনামূল্যে ইন্টারনেট, ব্যাপক ভাতা ও কার্ডভিত্তিক সহায়তা—সবকিছু একসঙ্গে করতে গেলে রাজস্ব কাঠামো কীভাবে সামলাবে, তা পরিষ্কার নয়। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কর ন্যায্যতা ও মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে এটি কীভাবে সম্ভব হবে—সে ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।
যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও আধুনিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট, এআই ও অটোমেশন যুগে চাকরির ভবিষ্যৎ, বা শিক্ষা কারিকুলামের মৌলিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত নেই। পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট—বিশেষ করে উপকূলীয় বাস্তুচ্যুতি, নগর বস্তি ও পানিসংকট—এই বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে আসতে পারত। স্বাস্থ্যখাতে কাঠামোগত সংস্কার, প্রাইমারি হেলথ কেয়ার শক্তিশালী করা এবং মানসিক স্বাস্থ্য—এসবও তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান।
এগুলো মোকাবিলায় বিএনপির জন্য করণীয় হবে—ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলোকে ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা, ২ বছরের মধ্যবর্তী লক্ষ্য এবং ৫ বছরের চূড়ান্ত লক্ষ্যে ভাগ করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা। প্রতিটি বড় প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থায়ন উৎস ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। তরুণদের জন্য আলাদা “ন্যাশনাল স্কিল অ্যান্ড ফিউচার জবস প্ল্যান”, জলবায়ু অভিযোজনের জন্য পৃথক কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষায় পরিমাপযোগ্য সূচক যুক্ত হলে ইশতেহার আরও শক্ত হতো।
সব মিলিয়ে, এই ইশতেহার মানুষের মৌলিক চাহিদা, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভাষা একসঙ্গে ধরতে পেরেছে—এটাই এর বড় সাফল্য। এখন আসল প্রশ্ন প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন। যদি বিএনপি কথার সঙ্গে কাজের স্পষ্ট রূপরেখা দিতে পারে এবং ক্ষমতায় গেলে প্রাথমিক এক বছরের মধ্যেই দৃশ্যমান সংস্কার শুরু করে—তাহলে এই ইশতেহার কাগুজে দলিল থাকবেনা, বরং হয়ে উঠতে পারে একটি জনবান্ধব রাষ্ট্র রূপান্তরের ভিত্তি।
মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
