লাইভ বিতর্ক একটি রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ানোর কৌশল

শেয়ার করুন

জামায়াত কেন হঠাৎ লাইভ বিতর্কের কথা তুলছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুব জটিল নয়। রাজনৈতিক পরিসরে নিজের গুরুত্ব বাড়ানো, আলোচনার কেন্দ্রে আসা এবং বড় দলের সঙ্গে নিজেকে সমমর্যাদার জায়গায় দাঁড় করানোর চেষ্টা—এসবই এই ধরনের প্রস্তাবের পেছনের বাস্তব উদ্দেশ্য। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান সামাজিক মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে প্রকাশ্যে লাইভ বিতর্কের আহ্বান জানিয়ে ঠিক সেই কৌশলটাই প্রয়োগ করেছেন। এতে চমক আছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা গণতান্ত্রিক কোনো কাঠামোর ভেতর থেকে আসা উদ্যোগ নয়—বরং এটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক নাটকীয়তা, যার লক্ষ্য মূলত মনোযোগ কুড়ানো।

পশ্চিমা গণতন্ত্রে উন্মুক্ত বিতর্ক একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের মুখোমুখি বিতর্ক আয়োজন করে নিরপেক্ষ কমিশন বা বড় মিডিয়া হাউস। যুক্তরাজ্যে বিবিসি কিংবা আইটিভি দলীয় নেতাদের নিয়ে ডিবেট আয়োজন করে। ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডাতেও একই রকম কাঠামো দেখা যায়—সেখানে বিতর্ক হয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক, নিয়মতান্ত্রিক এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে। ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্ট দিয়ে কাউকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া সেই সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না।

বাংলাদেশে এই চর্চা গড়ে ওঠেনি—এটা সত্য। কিন্তু এর দায় কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর নয়। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও নির্বাচন-পূর্ব গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরিতে বাস্তব কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিতর্ক সংস্কৃতি চালু করা, বড় দলগুলোর নীতিগত মুখোমুখি আলোচনা নিশ্চিত করা—এসব তাদের তথাকথিত সংস্কার এজেন্ডার মধ্যেই পড়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ফলে এখন স্পষ্ট যে সংস্কার ছিল স্লোগান, কাঠামোগত পরিবর্তনের আন্তরিকতা সেখানে অনুপস্থিত।

এই প্রেক্ষাপটে যদি প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, বিটিভি কিংবা কোনো স্বীকৃত নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের আমন্ত্রণ জানাত—তাহলে সেটি হতো অর্থবহ। সেখানে দলগুলোর অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শাসনব্যবস্থা কিংবা মানবাধিকার নিয়ে বাস্তব বিতর্ক হতে পারত। জনগণ তুলনামূলকভাবে বিচার করার সুযোগ পেত।

কিন্তু একজন দলীয় নেতা ব্যক্তিগতভাবে আরেকজন নেতাকে লাইভ বিতর্কে ডাকছেন—এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক মার্কেটিং। বড় দলের কাঁধে ভর করে নিজের দৃশ্যমানতা বাড়ানোর পুরোনো কৌশল মাত্র। তাই এই আহ্বানকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কোনো বাস্তব কারণ নেই। এটি নীতিনির্ভর রাজনীতির সূচনা নয়—বরং প্রাসঙ্গিক থাকার মরিয়া প্রচেষ্টা, যা সবাই কমবেশি বুঝে ফেলেছে।

লেখক: মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত