ব্যালট বনাম বট….
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির একটি দিনের ঘটনা নয়। এর বাস্তব সূচনা ঘটে ১০ ফেব্রুয়ারির সরকারি ছুটি থেকেই। ঢাকাসহ বড় শহরগুলো থেকে মানুষ পরিবার নিয়ে গ্রামের পথে ছুটে যায়। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে ছিল অস্বাভাবিক ভিড়। কর্মজীবী মানুষের এই আগাম যাত্রা স্পষ্ট করে দেয়-ভোট এখনও বাংলাদেশের মানুষের নাড়ীর সঙ্গে যুক্ত। ভোটহীনতার মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার যেসব প্রচেষ্টা চলছিল, মানুষের এই নীরব জনস্রোত ছিল তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ।
মানুষ নিরাপদ নির্বাচন যেমন চায়, তেমনি চায় যোগ্য জনপ্রতিনিধি এবং নিজেদের মতো মানুষ। এবারের নির্বাচনের শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও হাসান মামুন। গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দলীয় ও স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে নির্বাচন কমিশন, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন ‘মজলুম নেতা’ আসলাম চৌধুরী।
কুমিল্লার দেবিদ্বারে হাসনাত আবদুল্লাহ সহজেই মানুষের মন জয় করলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাবে ভোটারদের বাস্তব পালস ধরে রাখতে না পারায় আসনটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। ঢাকা–৮ আসনে মির্জা আব্বাস প্রচারণাকালে ধারাবাহিক ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে প্রার্থী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। ঢাকা–১৭ আসনে জামায়াত প্রার্থীর বক্তব্যে ক্যান্টনমেন্ট ও সেনাবাহিনী টেনে আনার ঘটনায় নির্বাচন হঠাৎই জাতীয় উদ্বেগের কেন্দ্রে চলে আসে।
এবার ঢাকাকেন্দ্রিক ভোটার মাইগ্রেশন ছিল চোখে পড়ার মতো। লাখো মানুষ আগেভাগেই নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ায় রাজধানী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বে একটি নতুন ট্রেন্ড। অন্যদিকে এনসিপির প্রার্থীরা ভোটের আগে যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্রমেই নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন।
পটুয়াখালী–৪ আসনে একজন ত্যাগী বিএনপি কর্মীর বিতর্কিত ভূমিকা দলীয় রাজনীতিতে মূল্যবোধ সংকটকে সামনে আনে। একই এলাকায় পটুয়াখালী ২ আসনে জামায়াতে ইসলামী বিপুল অর্থ ও জনবল ঢেলে রাতদিন মাঠে থাকলেও তৃণমূলভিত্তিক প্রার্থীর জনপ্রিয়তা প্রশ্ন তোলে-রাজনীতি কি সংগঠনের জোরে চলে, নাকি মানুষের আস্থায়?
নোয়াখালী–৬ ও হাতিয়ায় ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে কোস্টগার্ড না নৌবাহিনী—এই বিতর্ক কয়েকদিন ধরে জাতীয় টিভির লিড নিউজ ছিল। উপকূলীয় এলাকায় কেন্দ্র পাহারা, ব্যালট পরিবহন ও ভোটার চলাচল নিয়ে প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এর পাশাপাশি এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল ডিজিটাল অপপ্রচার। মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি মোবাইল স্ক্রিনে চলেছে আরেকটি অদৃশ্য যুদ্ধ। হাজার হাজার বট ও ক্লোন আইডি ব্যবহার করে একই লেখা, একই ছবি ও একই মন্তব্য ছড়িয়ে কৃত্রিম জনমত তৈরির চেষ্টা হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ইউনিট ও বিটিআরসি একাধিক ব্রিফিংয়ে জানায়, একই IP ব্লক থেকে শত শত রাজনৈতিক পোস্ট ও কমেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে-যাকে তারা ‘স্ক্রিপ্টেড অ্যাক্টিভিটি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। মেটার দক্ষিণ এশীয় ইন্টিগ্রিটি রিপোর্ট এবং টিআইবির প্রি-ইলেকশন পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশকেন্দ্রিক ‘coordinated misinformation network’-এর কথা উঠে আসে। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—ভুয়া জনপ্রিয়তা দেখানো, নির্দিষ্ট প্রার্থীকে হঠাৎ আলোচনায় আনা এবং সাধারণ ভোটারকে বিভ্রান্ত করা। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় অপপ্রচার হয়েছে মাঠে নয়—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো-তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান, এই দুই শীর্ষ নেতা কখনও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান তিনবার বড় ব্যবধানে হারলেও এবারও মাঠে আছেন, আর তারেক রহমান জীবনে প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। অথচ রাজনৈতিক সমীকরণ এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, এই দুইজনের যেকোনো একজন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন—যা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
সব মিলিয়ে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো একদিনের ভোট নয়। এটি মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ। ১০ ফেব্রুয়ারির ঘরমুখো জনস্রোত থেকে শুরু করে ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট—সবকিছু মিলিয়ে মানুষ আবার বুঝিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রের মালিকানা এখনও কাগজে নয়—মানুষের মনেই লেখা থাকে।
মোঃ হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
