স্বাধীনতার পরে পররাষ্ট্রের নেতৃত্বে রাজনীতি, পেশাদারিত্ব ও সামনে খলিলুর রহমানের চ্যালেঞ্জ

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিহাস মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়-পররাষ্ট্রনীতির চেয়ারে বসেছেন প্রধানত রাজনীতিকরা, আর হাতে গোনা কয়েকজন এসেছেন কূটনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক ধারায়। এই বাস্তবতা শুধু সংখ্যার নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনেরও প্রতিফলন।

রাষ্ট্র গঠনের সূচনালগ্নে দায়িত্ব পান আইনবিদ ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। তাঁর সময়ে মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নতুন রাষ্ট্রের পরিচয় প্রতিষ্ঠা। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে দীর্ঘ ছাপ রেখে যান আব্দুস সামাদ আজাদ। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি কূটনীতিকের দক্ষতায় OIC, NAM ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করেন। অনেকের কাছেই তিনি এখনো মানদণ্ড-যেখানে রাজনৈতিক বৈধতা ও পেশাগত কূটনীতি একসঙ্গে কাজ করেছে।

২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এম. মোরশেদ খান। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী-রাজনীতিক, ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট নন। তাঁর সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের চেষ্টা দেখা গেলেও ৯/১১–পরবর্তী বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতা, জঙ্গিবাদ ও মানবাধিকার প্রশ্ন বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে চাপের মুখে ফেলে। এই পর্বটি দেখিয়েছে—শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি চালালে আন্তর্জাতিক আস্থার জায়গায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যদি না পেছনে শক্ত কূটনৈতিক কাঠামো থাকে।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আমলে দায়িত্ব পান ডা. দীপু মনি—রাজনীতিক হলেও সাবেক কূটনীতিক হিসেবে তিনি সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অগ্রগতি আনেন। এরপর আবুল হাসান মাহমুদ আলী দায়িত্ব পালন করেন তুলনামূলক স্থিতাবস্থার মধ্যে। আবার পেশাদার কূটনৈতিক ধারা স্পষ্ট হয় এ কে আব্দুল মোমেন-এর সময়ে; জাতিসংঘে সাবেক রাষ্ট্রদূত হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরায় তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সর্বশেষ ড. হাসান মাহমুদ দায়িত্ব নিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে রাজনৈতিক বার্তাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

এই ধারাবাহিকতার মাঝেই আসে ২০২৬ সালের নতুন মোড়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত করেন পেশাদার কূটনীতিক খলিলুর রহমানকে। তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী করেছেন। এটি বিএনপির আগের রাজনীতিক-কেন্দ্রিক মডেল থেকে একটি স্পষ্ট সরে আসা। তবে বিতর্কও তৈরি হয় তাঁর অতীত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে, বিশেষ করে আলোচিত মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগ ঘিরে। ফলে এই নিয়োগ একদিকে পেশাদারিত্বের ইঙ্গিত দিলেও, অন্যদিকে রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন সামনে আনে।

১৯৭২ থেকে ২০২৬-এই ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতা একটি পরিষ্কার শিক্ষা দেয়। রাজনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে পারেন, কিন্তু ধারাবাহিক কূটনৈতিক ফল সবসময় আনতে পারেন না। আবার আমলা-কূটনীতিকরা পেশাগতভাবে দক্ষ হলেও তাঁদের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট সীমিত থাকে। যেখানে এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটেছে-বিশেষ করে সামাদ আজাদ বা মোমেনের সময়ে—সেখানেই বাংলাদেশ তুলনামূলক কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি পেয়েছে।

আজকের প্রেক্ষাপটে খলিলুর রহমানকে সামনে আনা সেই সমন্বয়েরই একটি চেষ্টা। প্রশ্ন একটাই-এবার কি রাজনৈতিক বৈধতা ও কূটনৈতিক পেশাদারিত্ব একসঙ্গে কাজ করবে, নাকি এটিও ইতিহাসের আরেকটি পরীক্ষামূলক অধ্যায় হয়ে থাকবে? উত্তর দেবে সময়ই।

হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত