রাষ্ট্র মেরামত আগে, নাকি দল—সরকারে থাকা বিএনপির সামনে অগ্রাধিকার

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রেক্ষাপটে দলটির সামনে যে বড় কৌশলগত প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে তা হলো—এ মুহূর্তে তাদের জন্য কোনটি বেশি জরুরি: রাষ্ট্র মেরামত, না দল মেরামত?

বিরোধী রাজনীতির সময় অগ্রাধিকার থাকে সংগঠন টিকিয়ে রাখা, তৃণমূলকে সক্রিয় রাখা, রাজনৈতিক বার্তা ছড়ানো এবং জনসমর্থন সুসংহত করা। কিন্তু সরকারে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই অগ্রাধিকার বদলে যায়। তখন আর দল কেবল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়; তখন সেটি রাষ্ট্রক্ষমতার বাহক। জনগণ ভোট দেয় আন্দোলনের ভাষণ শুনে নয়, শাসনের ফল দেখার প্রত্যাশায়। ফলে সরকার গঠনের পর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রকে কার্যকর, বিশ্বাসযোগ্য ও স্থিতিশীল রাখা।

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর Political Order in Changing Societies গ্রন্থে যে কথাটি জোর দিয়ে বলেছেন তা আজও প্রাসঙ্গিক—রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না করা গেলে অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ক্ষমতা অর্জনই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; সেই ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে কার্যকর করা—সেটিই মূল চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র মেরামত বিলম্বিত হলে রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষয় হতে শুরু করে।

রাষ্ট্র মেরামত বলতে কেবল প্রশাসনিক রদবদল বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে আইনের শাসন শক্তিশালী করা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট রাখা, এবং প্রশাসনকে পেশাদার ও নিরপেক্ষ রাখা। রবার্ট এ. ডাহল তাঁর Polyarchy–এ দেখিয়েছেন, গণতন্ত্রের মান নির্ভর করে প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণের ওপর। সরকারে বসে যদি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রক্ষা না করা যায়, তবে গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators ধারাবাহিকভাবে দেখিয়ে আসছে যে আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উন্নতি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের Corruption Perceptions Index–এও দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বাড়লে অর্থনৈতিক আস্থা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং সরকার হিসেবে বিএনপির সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে বাজারে স্থিতি, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়; দলীয় কাঠামো সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতে নয়।

তবে এই যুক্তির বিপরীত দিকও আছে। দল যদি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ক্ষীণ হয় বা তৃণমূল বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে সরকারী সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মরিস ডুভারজার তাঁর Political Parties–এ দেখিয়েছেন, দলীয় কাঠামোর প্রকৃতি রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনকে প্রভাবিত করে। অগণতান্ত্রিক দল থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়া কঠিন। কাজেই দল মেরামত সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়—এমন দাবি করা বাস্তবসম্মত নয়।

বরং বলা যায়, এখন দল মেরামতকে রাষ্ট্র মেরামতের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে প্রশাসনিক সংস্কারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশ, স্বজনপ্রীতি বা প্রভাব–বাণিজ্যের ঝুঁকি বেড়ে যায়—এ অভিজ্ঞতা কেবল বাংলাদেশের নয়, বহু গণতান্ত্রিক দেশের। হারবার্ট কিটশেল্ট তাঁর তুলনামূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, দলীয় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ দুর্বল হলে রাষ্ট্রপর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতামূলক রাজনীতি বাড়ে। ফলে দলীয় আধুনিকীকরণ একেবারে গৌণ নয়; এটি সংস্কারের স্থায়িত্বের পূর্বশর্ত।

তবু অগ্রাধিকারের প্রশ্নে সময়–মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। এই মুহূর্তে সরকার হিসেবে বিএনপির ওপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে তা হলো রাষ্ট্র পরিচালনা। জনগণের প্রত্যাশা এখন ফলাফলে। তারা দেখতে চায় আইনের শাসন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের বাস্তব প্রতিফলন। দলীয় সম্মেলন বা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস অপেক্ষা করতে পারে; কিন্তু বিচারব্যবস্থার সংস্কার বা অর্থনৈতিক স্থিতি অপেক্ষা করে না। রাজনৈতিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় যদি শাসনের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকে।

ইতিহাসও এই শিক্ষা দেয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া–র শাসনামলেও অবকাঠামো ও কিছু নীতিগত পরিবর্তন দৃশ্যমান ছিল। এসব উদ্যোগের স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ভর করেছে দলীয় ঐক্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। অভিজ্ঞতা বলছে, রাষ্ট্র ও দল—দুটির ভারসাম্য রক্ষা করাই সাফল্যের চাবিকাঠি।

অতএব প্রশ্নটির সরল উত্তর খুঁজতে গেলে বলা যায়—এই মুহূর্তে রাষ্ট্র মেরামতই বেশি জরুরি। কারণ সরকারে থেকে প্রথম দায়িত্ব জনগণের প্রতি, দলের প্রতি নয়। তবে এই অগ্রাধিকার দল মেরামতের গুরুত্ব অস্বীকার করে না; বরং তা সমান্তরাল প্রক্রিয়া হিসেবে চলতে হবে। রাষ্ট্র হলো দৃশ্যমান দায়িত্ব; দল হলো অদৃশ্য ভিত্তি। ভিত্তি মজবুত না হলে দায়িত্ব টেকে না, কিন্তু দায়িত্বে ব্যর্থ হলে ভিত্তিও ভেঙে পড়ে।

বিএনপির সামনে এখন যে সুযোগ এসেছে তা কেবল ক্ষমতার নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের সুযোগ। তারা যদি রাষ্ট্র মেরামতের মাধ্যমে আইনের শাসন, প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবে দলীয় শক্তিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুদৃঢ় হবে। আর যদি দলীয় স্বার্থ রাষ্ট্রের ওপর প্রাধান্য পায়, তবে রাজনৈতিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয় হবে।
এই বাস্তবতায় সম্পাদকীয় অবস্থান স্পষ্ট: সরকারে থাকা অবস্থায় বিএনপির প্রধান ও তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাষ্ট্র মেরামত। দল মেরামত চলবে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকারই হবে সবার আগে। গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে জনগণ; আর জনগণ এখন ফলাফল দেখতে চায়।

মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত