বাংলাদেশের এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু ভোটের হিসাব নয়…

ফাইল ফটো।
শেয়ার করুন

কথিত আছে জামায়াত ভোটের মাত্র এক সপ্তাহ আগে ব্যালট প্রতীক পেয়েছে—কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা অনেক দিন ধরেই ক্ষমতার এক প্রভাবশালী অংশ হিসেবে মাঠে ছিল। প্রশাসনিক সহানুভূতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো—সব মিলিয়ে তারা নির্বাচনী লড়াইয়ে একটি বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। তাদের প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ সেই বাস্তবতার আংশিক প্রমাণ।

নির্বাচনের আগে বাজারে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার নতুন কাগুজে নোট ছাড়া হয়েছে—এমন একটি গুঞ্জন রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই রাষ্ট্রের কাজ, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচনী সংস্কৃতিতে অর্থের প্রভাব নতুন কিছু নয়। ভোট কেনা-বেচার সংস্কৃতি বহুদিন ধরেই এই অঞ্চলের রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।

এই নির্বাচনে ভোটের আচরণেও বিচিত্রতা দেখা গেছে। বিএনপির কিছু ছদ্ম সমর্থক বা সুবিধাবাদী অংশ লোভ, হিসাব কিংবা ধর্মীয় আবেগের সুযোগ নিয়ে জামায়াতের দিকে ভোট সরিয়েছে। আবার অন্যদিকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের অভ্যাস ভেঙে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। এটিকে অনেকেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাদের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখছেন।

আওয়ামী লীগের ভেতরেও একই রকম বিভাজনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একটি অংশ কৌশলগতভাবে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে, আর আরেক অংশ স্থানীয় বাস্তবতা ও নিরাপত্তার কারণে জামায়াত প্রভাবিত এলাকায় তাদের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে—জামায়াত প্রশাসনিক সহানুভূতি ও সাংগঠনিক শক্তি পেয়েও সরকার গঠন করতে পারেনি। সমাজের একটি বড় অংশের কৌশলগত ভোট সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি মৌলিক বাস্তবতা মনে রাখতে হবে—
বিএনপি সমর্থকভিত্তিক দল, আওয়ামী লীগ সংগঠকভিত্তিক দল, আর জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক দল।

সমর্থকের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা। জাতীয় পার্টি এই নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। বিএনপির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

বিএনপি যদি টিকে থাকতে চায়, তবে সমর্থকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দলের নামে যে নিম্নমানের ‘ক্যাডার রাজনীতি’ গড়ে উঠেছে—যেখানে অনেকেই দলীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত ক্ষমতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে—তাদের নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কারণ এরা দলের শক্তি নয়, বরং দলের বোঝা।

সম্প্রতি এক ডিসি ট্রাফিককে বদলির বিষয়ে প্রকাশিত ফোনালাপ বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর ইঙ্গিত বহন করে। ক্ষমতায় এসে যদি প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি প্রকাশ পায়, তবে তা রাজনৈতিক নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশের রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে একটি বিষয় পরিষ্কার এই নির্বাচনে শুধু দল নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরও কৌশলগতভাবে অবস্থান নিয়েছে। আর সেই কারণেই প্রশাসনিক প্রভাব ও সাংগঠনিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও এককভাবে ক্ষমতা দখলের পথ অনেকের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
গণতন্ত্রের আসল শক্তি এখানেই শেষ পর্যন্ত জনগণের হিসাবটাই বড় হয়ে ওঠে।

মোঃ হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত