ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বসছে আজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায়। বিদায়ী দ্বাদশ সংসদের স্পিকার (ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী) পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার (অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু) ফৌজদারী মামলায় কারাবন্দি থাকায় ব্যতিক্রমী এক প্রেক্ষাপটে আজ প্রথমে স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে শুরু হবে অধিবেশন। পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের পর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করার জন্য বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন। দলের আরেকজন সংসদ সদস্য সেটি সমর্থনের পর ওই জ্যেষ্ঠ সদস্য বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন আজ অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করতে পারেন। বিকল্প হিসেবে এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও রয়েছে আলোচনায়। সভাপতির আসন গ্রহণের পর নির্বাচন করা হবে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। তবে, গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক হলেও নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নাম জানানো হয়নি। বৈঠকে দলের এমপিরা স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার মনোনয়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
এছাড়া, সংবিধান অনুযায়ী আজ সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ভাষণই সংসদে পাঠ করবেন রাষ্ট্রপতি। জানা গেছে, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিরোধীদল রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট করতে পারেন। ভাষণ প্রদানের জন্য রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণার সঙ্গেসঙ্গেই তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে পারেন। ভাষণ শেষে আবারও সংসদে ফিরতে পারেন বলে বিরোধীদলের একাধিক এমপির সঙ্গে কথা বলে আভাস মিলেছে। এছাড়া জুলাই সনদ ইস্যুতেও এবার প্রথমদিন থেকেই অধিবেশন উত্তপ্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংবিধানের ৭২ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসাবে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যেই নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে এর চারদিন আগেই আজ সংসদ শুরু হচ্ছে।
সর্বশেষ সংসদ বসেছিল ২০২৪ সালের ৩ জুলাই, সাড়ে ১৯ মাস পর বসছে সংসদ
জাতীয় সংসদের সর্বশেষ বৈঠক বসেছিল ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। এটি ছিল দ্বাদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষদিন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন ছিল সেটা। ওই বছরের ৫ জুন শুরু হয়ে ৩ জুলাই ১৯ কার্যদিবসের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল শেখ হাসিনার সরকারের সময়কার ওই অধিবেশন।
এরপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ওই বছরেরই ৫ আগস্ট বিদায় নেয় শেখ হাসিনার সরকার। একই বছরের ৮ আগস্ট যাত্রা শুরু করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দীর্ঘ ১৮ মাস পর এবছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১৯ মাস পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আবার প্রাণবন্ত হতে যাচ্ছে সংসদ।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন সেই রিক্সাচালক
আজ অধিবেশন চলাকালে সংসদ গ্যালারিতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ নাফিজকে বহনকারী সেই রিক্সাচালক। গুলিবিদ্ধ নাফিজ রিক্সায় লম্বালম্বি শুয়ে আছেন, রিক্সাচালক তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন- এই ছবিটি জুলাই আন্দোলনের হাজারো ছবির মধ্যে অন্যতম, যা বহু মানুষের মনে দাগ কেটেছে। এছাড়াও জুলাই আন্দোলনে শহিদ আরো চারটি পরিবারের সদস্যরাও আজ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গ্যালারিতে বসে সংসদ কার্যকম দেখবেন।
জুলাই সনদের কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য সরকার সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে: বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে তারেক রহমান
অধিবেশন শুরুর আগে গতকাল সংসদ ভবনে সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক হয়েছে। সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির সংসদীয় দলের প্রধান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেলা সোয়া ১১টায় শুরু হওয়া এই বৈঠক শেষ হয় বেলা ১টায়। সভায় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্বাগত বক্তব্য দেন। এরপর বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর এক পাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অন্য পাশে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বসেন। সভায় বিএনপির ২০৯ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির নেওয়া জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি এবং সামনের দিনগুলোতে করণীয় বিষয়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দিকনির্দেশনা দেন। সভায় বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছে। কিন্তু ভোটের আঙুলের কালির দাগ মোছার আগেই আমরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এটাই হচ্ছে বিএনপি। এই বিএনপিকেই মানুষ দেখতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হবে। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুমকে সামনে রেখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সবাইকে সতর্ক করেন তিনি। জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সনদের কিছু বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। সরকার যেসব বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে বিএনপি যতটুকুতে সম্মত হয়েছে, সরকার ততটুকুই বাস্তবায়ন করবে।
সভায় মন্ত্রিসভার তরুণ সদস্যদের নিয়মিত ও সময়মতো অফিস করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রিসভায় অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা আছেন। বিশেষ করে তরুণদের সকাল নয়টার মধ্যে অফিসে যেতে হবে। অফিসে যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন মেনে চলারও পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ট্রাফিক আইন মেনে চলেন বলে সভায় উল্লেখ করেন। এছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
চলনে-বলনে মার্জিত থাকতে এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় সতর্ক থাকার জন্য মন্ত্রী-এমপিদের পরামর্শ
সংসদীয় দলের বৈঠকে মন্ত্রী এবং দলের সংসদ সদস্যদের চলনে-বলনে মার্জিত ও সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য জানান, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে যার যে দায়িত্ব, সেটির বাইরে যেন কেউ গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য না করেন- এবিষয়ে তিনি সবাইকে নির্দেশনা দেন।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কে হবেন, চূড়ান্ত করবেন তারেক রহমান
বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে সংবাদ সম্মেলনে সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ভার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। সংসদীয় দলের বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কারা হচ্ছেন তা আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) আমরা জানতে পারব।’
চিফ হুইপ জানান, আজ স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে একজন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করবেন। এরপর সংসদ নেতা এই সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য কোনো একজন জ্যেষ্ঠ এমপির নাম প্রস্তাব করবেন। কোনো একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। তারপর ওই সদস্য (যার নাম প্রস্তাব করা হবে) সভাপতিত্ব করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উঠবে, যাচাই-বাছাইয়ে হবে বিশেষ কমিটি
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ আজ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য আজকের বৈঠকে একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হবে। সে কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকবেন। সংবাদ সম্মেলনে সরকারি দলের ছয় হুইপও উপস্থিত ছিলেন।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে যারা আলোচনায়
বিএনপির একাধিক সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, দলের নেতা আলতাফ হোসেন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, ড. আবদুল মঈন খান ও ড. ওসমান ফারুকের নাম স্পিকার পদে আলোচনায় রয়েছে। আর ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় রয়েছেন জয়নুল আবদিন ফারুক, বরকত উল্যাহ বুলু ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।
যেভাবে নির্বাচিত হবেন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার
সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার। তার সভাপতিত্বে অধিবেশনের প্রথমে স্পিকার নির্বাচন করা হয়। এরপর স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে। তারপর অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য মূলতবি রাখা হয়। ওই সময়ে সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কক্ষে তার কাছে শপথ নেন নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। এবারও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তারা সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেবেন।
খ্লিতভাবে ডেপুটি স্পিকার নয়, আমরা চাই জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন: বিরোধীদলের এমপিদের বৈঠক শেষে জামায়াত আমির
ডেপুটি স্পিকারের পদটি জামায়াত থেকে দেওয়ার জন্য দলটিকে প্রস্তাব দিয়েছিল সরকারি দল বিএনপি। তবে, গতকাল পর্যন্ত জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপি এব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পায়নি। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত উদারতা দেখিয়ে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু, এবিষয়ে তারা কোনো ‘পজিটিভ রেসপন্স’ পাননি। পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, অধিবেশনের আগে গতকাল সংসদ ভবনে বিরোধী দলের এমপিদের নিয়ে বৈঠক করেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। সংসদ ভবনে বিরোধীদলের সভাকক্ষে সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন জামায়াতের ৬৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৬ জনসহ সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা।
পরে সংসদ ভবনের এলডি হলে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন জামায়াতের আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বিএনপির প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদ নেবে কি-না, এরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই সনদেই আছে যে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খ্লিতভাবে এটা চাচ্ছি না, আমরা চাই প্যাকেজ, আমরা চাই পিস মিল; পুরোটাই সেখানে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হোক এবং এর ভিত্তিতে আমরা যেন আমাদের ন্যায্য দায়িত্ব্ব পালন করতে পারি।
একই প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, সরকার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কথা বলেছে। আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই, জুলাই সনদের সংস্কারের প্রস্তাবগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হোক। এর আলোকে বিরোধীদলের যতটুকু পাওনা, আমরা ততটুকু চাই, এর বেশি চাই না।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংসদ সদস্য দুটি শপথই নিয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, দুঃখের বিষয় এখন পর্যন্ত সরকারি দল প্রথম শপথটি নেয়নি। ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আসুন জুলাইকে সম্মান করি। চব্বিশ থাকলেই ছাব্বিশ হবে, নইলে ছাব্বিশের অস্তিত্ব্ব থাকে না। চব্বিশকে অমান্য বা অগ্রাহ্য করে পাশ কাটিয়ে ছাব্বিশ জাতির জন্য কোনো সুখবর নয়। আমরা আশা করতে চাই, সরকারি দল এই কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করবে।
দেশের ৬৯ ভাগ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে রায় দিয়েছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, এটাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এর পক্ষে ভূমিকা রেখে যাব এবং আমরা চাইব যে চারটি বিষয় গণভোটে দেওয়া হয়েছিল, তার সবগুলো হুবহু গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হোক।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে জামায়াত কী ভূমিকা নেবে, জানতে চাইলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা অনেক আলাপ-আলোচনা করেছি এব্যাপারে। কালকে (আজ সংসদে) আমাদের ভূমিকা দৃশ্যমান আপনারা দেখবেন। যেমন সূর্য উঠবে, তেমন ভাষণ শুনবেন এবং আমাদের ভূমিকাও দেখবেন।
একটা দায়িত্ব্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, সব ব্যাপারে বিরোধিতা নয়, আবার না বুঝেও কোনো সহযোগিতা নয়। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারি দলের গৃহীত সব সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু দেশ ও জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা পদক্ষেপ নিলে আমরা আমাদের দায়িত্ব সেভাবেই পালন করব। ভুল করলে প্রথমে আমরা সেই ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব, পরামর্শ দেব। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদে যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াবো। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সরকার কোনো কিছু করতে চাইলে সেটা তারা পারবে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, কিন্তু যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য উত্তম।
ডা. শফিক বলেন, এই সংসদটা হঠাত্ করে এভাবে হয়নি, একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালে গঠিত সংসদ প্রথম তার মেয়াদ পূর্ণ করে। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এই সুযোগ এসেছিল। ২০০৮ সালে গঠিত সংসদও মেয়াদ পূর্ণ করেছিল। বাকি যেগুলো হয়েছে, সেগুলোকে জনগণ নির্বাচন হিসেবে দেখে না, মানে না। এর কোনো নৈতিক বৈধতা ছিল না। এরপর এ নির্বাচন তো ২০২৬ সালে হওয়ার কথা ছিল না। সংবিধান মানলে এ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। এটা ২০২৬ সালে হয়েছে চব্বিশের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণে।
এ প্রসঙ্গে চব্বিশে অনেক মানুষের শাহাদাতবরণ, আহত হওয়া, পঙ্গুত্ব্ববরণ এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে খুন, গুম, আয়নাঘরে নির্যাতন ও কারাবরণের কথা উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালকে জাতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’ উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, এই টার্নিং পয়েন্টগুলাকে যেমন আমরা ধারণ করি, আমরা সিরিয়াসলি ধারণ করি চব্বিশকে। জুলাই যোদ্ধাদের মূল স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমরা সব ক্ষেত্রে সুবিচার চাই, বৈষম্যহীন একটি সমাজ চাই। এই সমাজ গড়ার জন্যই এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে আরেকটা নির্বাচন হয়েছে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, সেটা হচ্ছে সংস্কার পরিষদের নির্বাচন। যে অর্ডিন্যান্সের কারণে সংসদ নির্বাচন হয়েছে, একই অর্ডিন্যান্স বলেছে দুটি নির্বাচন একই দিনে হবে। একটা সংস্কার বিষয়ে জনগণের মতামত গণভোট, আরেকটা সংসদ নির্বাচন। ফলাফল যেটা হয়েছে, সেটা সবাই দেখেছেন। আমরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দুটি ফলাফলই মেনে নিয়েছি। ফলে একটি নির্বাচনকে আরেকটি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এই নির্বাচন দুটি একটি আরেকটির পরিপূরক।
বর্তমান রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার অধিকার নেই: ডা. তাহের
এদিকে, জামায়াতের এমপিদের বৈঠক শেষে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে জামায়াত ডেপুটি স্পিকারের পদ নেবে কি-না, সেবিষয়ে দলটির সংসদীয় দল একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সিদ্ধান্তটা তখন খোলাসা হবে, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এবিষয়ে আলোচনা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে ডা. তাহের বলেন, তারা মনে করেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন যে তাকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াচ্ছে, তা তাদের কাছে বোধগম্য নয়। এবিষয়ে তারা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা কাল (আজ) জানা যাবে।
কার্যউপদেষ্টা কমিটিসহ বেশ কয়েকটি কমিটি হবে: সালাহউদ্দিন
বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে যা কিছু আমরা সম্মত হয়েছি, তার সব কিছুই ধারণ করবো। শহিদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও জনসাধারণের প্রত্যাশা নিয়ে আমরা কথা বলবো। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি সংসদীয় বিধি মোতাবেক স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। এরপর অধিবেশন বসবে, সেই অধিবেশনে প্রথমে সভাপতিমন্ডলির প্যানেল ঘোষণা করা হবে। এরপর শোক প্রস্তাব আসবে এবং শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনা হবে।
মন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ অধিবেশন চলাকালীন সংসদে আইনমন্ত্রী উপস্থাপন করবেন। কার্যউপদেষ্টা কমিটিসহ বেশ কয়েকটি সংসদীয় কমিটিও গঠন করা হবে। কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠক পরদিন অনুষ্ঠিত হবে। ১৫ মার্চ এবং আরো একদিন অধিবেশন চলার পর বিরতি হতে পারে।
