উত্তরা ও তুরাগের কাঁচা বাজার গুলোতে সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী
রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগের কাঁচা বাজার গুলোতে ইদানিংকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বমুখী। নানা ধরনের অজুহাতে চড়া সবজির খুচরা ও পাইকারি বাজার। স্থানীয় বাজার গুলোতে প্রকারভেদে দৈনন্দিন জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া। অধিকাংশ সবজির দাম অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। গেল দু’সপ্তাহ ব্যবধানে প্রকারভেদে সবজির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। বিশেষ করে তুরাগ, উত্তরা ও টঙ্গী বাজারে পাইকারি- খুচরা বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সবজি। ভোর থেকেই দরদাম আর কেনাবেচায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে উত্তরার ১০ নং সেক্টর স্ল্যুুইচ গেইট ফলের বাজার ও কামার পাড়া কাঁচা বাজারের সবজির আড়ৎ। তুরাগের ডিয়াবাড়ী কালা মার্কেট, নলভোগ কাঁচা বাজার ও চন্ডাল ভোগ (খালপাড়া বিদ্যুৎ অফিস- মসজিদ সংলগ্ন) খুচরা কাঁচা বাজার ও ফুলবাড়িয়া বাজারের ব্যবসায়ীরা কেউ কেউ ক্রেতাদের বলছে, আমরা একদামেই জিনিসপত্র এবং সবজি ক্রয় করি ; পরবর্তীতে আবার এক সবজি এক দামেই বিক্রিও করি। ইদানিং কালে সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই একটি টাকাও কম দেয়া যাবে না। “একদামে কিনি এবং একদামে বেচিও”। উত্তরা বিভাগের অবৈধ কাঁচা বাজার ও ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছে শতশত দোকানপাট। সংশ্লিষ্ট ও সচেতন মহল বলছে- বাজার সিন্ডিকেটের কারণে দাম কমছে না জিনিসপত্রের। দিনদিন সবজির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কিছুতেই কমছে না। ভেঙ্গে পড়েছে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাও। খবর একাধিক নির্ভরযোগ্য তথ্য সূত্রের।
আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) ইং সকালে ও দুপুরে দু’টি পাইকারি আড়ৎ এবং বিকেলে স্থানীয় কয়েকটি কাঁচা বাজার সরজমিনে পরিদর্শন করে এসব তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুসন্ধান ও খোঁজ খবর নিয়ে দেখা যায়, পাইকারিতেই বেশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে বেশিরভাগ সবজি। পাইকারি বাজারে কেজিতে ৮/১০ টাকা বেড়ে পটল ৭০-৮০ টাকা। সেটি খুচরা বাজারে ১০০ টাকায় আজ বিক্রি করা হচ্ছে। বেগুন ৮০/৯০ টাকা,
খুচরা বাজারে ১০০ -১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে করলা ৮০-১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৭০-৭৫ টাকা, কাঁচামরিচ ১০০/১২০ টাকা, টমেটো ৪০-৬০ টাকা ও গাজর ৮০/৯০ টাকায় বেঁচাকেনা হচ্ছে। পাইকারী বাজারে ৮০ টাকার বরবটি খুচরা বাজারে বিক্রি করা হয় ১০০-১২০ টাকা। আর ঢ্যাঁড়স কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৮০ -১০০ টাকা । আগাম শিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৮০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া কয়েকটি সবজির দাম স্থিতিশীল রয়েছে। ঝিঙে ৫০-৬০ টাকা, ধুন্দল ও কচুর লতি ৭০-১০০ টাকা, মুখি কচু ৮০-৯০ টাকা, পেঁপে ৩০-৪০ টাকা ও মিষ্টি কুমড়া ৫০-৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এমনটাই জানান- উত্তরা ১২ নং সেক্টর খালপাড় বড় মসজিদ ও ডেসকো (বিদ্যুৎ অফিস) সামনে কাঁচা মালের দোকানদার মোঃ আইয়ুব আলী।
সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর মানুষের পকেটে টাকা নেই, তারপর কাঁচা সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া। সবজি কিনতেই পকেট ফাঁকা! পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। খুচরায় কেজি প্রতি আরও ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি গুণতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। ঊর্ধ্বমুখী এই বাজারে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ক্রেতারা পড়েছেন বিপাকে। যে ব্যক্তি তার পরিবারের জন্য এক কেজি করে সবজি কিনতো, দাম বৃদ্ধির কারণে কিনছে আধা কেজি করে। অনেকে আবার ২৫০ গ্রাম (এক পোয়া) প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনে ফিরতে হচ্ছে বাড়ি। বর্তমান সময়ে কাঁচা মালের দাম আকাশ ছোঁয়া।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভোক্তারা বলছেন, বাজার মনিটরিং দুর্বল থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জৈনক আয়শা মা নামে এক নারী ক্রেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, বাজারে কার্যকরী কোনো মরিটংরিং ব্যবস্থা নেই। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা নিজেদের খেয়াল খুশি মতো দাম রাখছেন। আড়ৎদার থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও দোকানদার মিলে গড়ে তুলেছেন বিশাল সিন্ডিকেট। এক্ষেত্রে প্রতিবাদ করা কিংবা দেখারও যেন কেউ নেই।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, দাম চড়া থাকায় একদিকে পুঁজি যেমন বেশি লাগছে, তেমনি বিক্রিও হচ্ছে কম। তুরাগের নলভোগ কাঁচা বাজারের দোকানদার মো: মিলন বলেন, সবিজর দাম বাড়ায় ক্রেতারা পরিমাণে কম কিনছেন। বর্তমানে কিছু কিছু সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা জিনিসপত্র বেশি দামে কিনি এবং ক্রেতাদের কাছে বিক্রি ও করি। এছাড়া আমাদের কিছু করার নেই বলে জানান। শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ বলছে, সবজির বাজারে অস্থিরতা, বেশিরভাগের দাম ৭০- ৮০ টাকার ওপরে।
উত্তরা ও তুরাগের বাজারে সবজির দাম দিন দিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অস্থিরতা চললেও দাম কমার কোনো লক্ষ্যণও নেই। এরই মধ্যে বিশ্বে চলছে যুদ্ধ। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এর ফলে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।
সোমবার সকালে ও বিকেলে তুরাগের ডিয়াবাড়ী, চন্ডাল ভোগ, নলভোগ, খালপাড় ব্রিজ বাজার, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ৪, ৫, ৬ নং সেক্টর বাজার, জহুরা মার্কেট, আজমপুর কাঁচা বাজার, আব্দুল্লাহপুর বেরিবাধ বাজার, রেলগেইট বাহার, আশকোনা, বিমানবন্দর রেলগেইট বাজার, কসাইবাড়ি ও দক্ষিণখান বাজার, স্ল্যুইচ গেইট, কামার পাড়া, আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সবজির দাম আগের চেয়ে আরও বেড়ে গেছে। পেঁপে ছাড়া কোনো সবজিই ৭০/৮০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। সবজির বাজারে লাউ বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিচ ১০০ থেকে ১১০ টাকা । বেগুনের কেজি উঠেছে ১০০/১২০ টাকায়, যা অনেক পরিবারের জন্য এখন প্রায় বিলাসদ্রব্যে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ঝিঙে ৭০/৮০ টাকা, পটল ৯০/১০০ টাকা, ও টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৪০-৬০ টাকা কেজিতে। ৮০ টাকার বরবটি ১০০/১১০ টাকা, পেঁয়াজ ৩৫/৪০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ১০০/১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে দোকানিরা।
উত্তরা- তুরাগ ১২ নং সেক্টর খালপাড় বড় মসজিদ ও ডেসকো (বিদ্যুৎ অফিস) সামনে কাঁচা মালের দোকানদার মোঃ আইয়ুব আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, এ রোডে ছোট বড় প্রায় ৩০/৪০টি বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট রয়েছে। তবে অধিকাংশ দোকান সবজি, মাছ, মুরগী, ফল, চা-পান, মোবাইল, খাবারের দোকান প্রমুখ। তিনিসহ একাধিক দোকানদার আরও জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি), প্রশাসন, রাজউজ, রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্থানীয় লোকজনকে ম্যানেজ করেই আমরা ব্যবসা করি। এদিকে ডিয়াবাড়ী কালা মিয়া মার্কেট বাজারে সবজি কিনতে আসা গৃহিণী ছদ্মনাম জুলেখা বেগম, মনির ও আমেনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটা পরিবারের জন্য সামান্য বাজার করতেই এখন হাজার টাকা লাগে। আগে যেখানে তিন-চার ধরনের সবজি কিনতে পারতাম, এখন বাধ্য হয়ে শুধু একটা-দু’টো সবজি নিয়েই ফিরতে হয়। দাম শুনলেই মাথা ঘুরে যায়। এখানকার ব্যবসায়ীরা নাকি একদামে পণ্য কিনে; আবার একদামেই আমাদের কাছে বিক্রি করে থাকে। এক টাকাও কম নেয় না ব্যবসায়ীরা। নিলে নাও; না কিনলে সামনে হাঁট।
তুরাগের নলভোগ ও চণ্ডাল ভোগ কাঁচা বাজারে চাকরিজীবী ছদ্মনাম মাসুদ রানা ও জীবন আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, কাঁচা বাজারে গেলে মনে হয় আমরা সাধারণ মানুষ আর কিছুই কিনতে পারব না। বেতনের টাকা গলে যাচ্ছে বাজারেই। সন্তানদের পছন্দের সবজি কিনতে পারছি না, এটা ভীষণ কষ্টের। বাড়ি ভাড়া দিয়ে কোন মতে সন্তানের খরচ চালাই। আমাদের দুঃখ কষ্ট বুঝার লোক নাই। সবজির বাজারে অস্থিরতা চলছে। দামও আকাশ ছোঁয়া। এক মুঠো লাল, কলমি, পাটশালও ছোট ডাটা শাল ২০/৩০ টাকা। এক পিচ লাউ ১০০/১২০ টাকা।
অনেকেই বলছে, আমাদের হাতে তো কিছু নেই। পরিবহন খরচের পাশাপাশি ও অন্যান্য খরচাপাতি বেড়েছে। বৃষ্টি ও প্রচন্ড রোদের কারণে ফসলি জমির অনেক ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। তুরাগের চণ্ডাল ভোগ এলাকার খুচরা মুদি দোকানদার মো: হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব এবং সাইফুল ইসলাম জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। এছাড়া ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের পলিসি ও যুক্তি তুলে ধনের এই দুই পুরানো ব্যবসায়ী। ফলে চাল, ডাল, তৈল, চিনি ও সিগারেট এবং নানান জিনিসপত্রের দাম কমার কোনো সুযোগ নেই। যুদ্ধের কারনে বাজারে জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলক ভাবে আগের চেয়ে একটু বেশি। এরপর পরিবহন খরচ আছে। তার দোকানে মুখ সেলফ করা (দাঁড়ি) কাটার এক পিচ ব্লেডের দাম ৬০ টাকা। অথচ পাশের এক দোকান থেকে কিনতে পাওয়া গেল ৪০ টাকায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এমনিতেই হাবিব এর দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলক ভাবে অন্য দোকানের চেয়ে একটু বেশি রাখে। পাশাপাশি তার দু’টি দোকান আছে। দোকানে কর্মচারী আছে ৫/৬ জন।
তুরাগ ও উত্তরার গৃহিণীরা অভিযোগ করে বলছেন, শুধু সবজি নয়, চাল, ডাল, মাছ, কাঁচা সবজি, মুরগী সহ সব কিছুর দাম একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে মাসে যে টাকায় বাজার হতো, এখন সেই টাকায় অর্ধেকও হয় না। একদিকে বাচ্চাদের পড়াশোনা, অন্যদিকে সংসার-সবকিছু সামলাতে এখন আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে জিনিস পত্রের দাম বৃদ্ধি করছেন। বর্তমান সরকারের এদিকে নজর দেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সচেতন মহল বলছে, ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের বাজারে এবার ক্রেতার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে বাজারগুলোতে জিনিসের দাম আকাশ ছোঁয়া।
বাজারে কথা হয় একাধিক ক্রেতার সাথে। তারা অভিযোগ করে বলছে, পরিবারে দৈনন্দিন খরচ সামলানো দিনদিন কঠিন হয়ে পড়েছে। ঊর্ধ্বমুখী বাজারে নতুন করে চাপ নতুন করে বাড়ছে। এখনই বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিংয়ের দরকার। তা না হলে দাম কিছুতেই কমবে না।
এবিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বানিজ্যমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, উত্তরা বিভাগের পুলিশের ডিসি, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) প্রশাসক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ভুক্তা অধিকার সংরক্ষণের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তুরাগ ও উত্তরার সর্বস্তরের জনগণ।
