ত্যাগীদের রক্তে গড়া রাজনীতি, সুবিধাবাদীদের দখলে

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নির্মম বাস্তবতা বারবার ফিরে আসে-দুর্দিনে যারা রাজপথে থাকে, তারাই ইতিহাস গড়ে, কিন্তু সুদিন এলে সেই ইতিহাসের মালিকানা চলে যায় অন্যদের হাতে। এই বৈপরীত্য আবেগের নয়, এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সময় যারা মামলা, নির্যাতন, আর্থিক বিপর্যয় সহ্য করেছে, তারা ছিল তৃণমূলের কর্মী। তাদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দল টিকে ছিল। অথচ রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে শুরু করলে দেখা যায়, এই ত্যাগীদের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে এবং সামনে চলে আসে এমন এক শ্রেণি, যারা দুর্দিনে অনুপস্থিত থাকলেও সুদিনের সম্ভাবনায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই চিত্র আওয়ামী লীগ-এর ক্ষেত্রেও ভিন্ন নয়। একটি দল যত বড়ই হোক, যদি সে তার কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তৈরি হয় এবং সংগঠন ভেতর থেকেই ক্ষয়ে যেতে থাকে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন কোনো দলকেই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে পারে না।

রাজনীতির এই সংকটকে বোঝার জন্য রাজনৈতিক তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন দেখিয়েছেন, যখন কোনো রাজনৈতিক দল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে ব্যর্থ হয়, তখন তা ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে এবং সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর দখলে চলে যায়। একইভাবে রবার্ট মিখেলস তার “Iron Law of Oligarchy”-তে বলেছেন, যে কোনো সংগঠন শেষ পর্যন্ত একটি ছোট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বাংলাদেশের দলীয় বাস্তবতায় এই তত্ত্বগুলোর প্রতিফলন স্পষ্ট।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাংবাদিক সুলতানা রহমান-এর ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতীক। যখন একটি দল চরম সংকটে পড়ে এবং তার সংগঠনিক প্ল্যাটফর্মগুলো ভেঙে যায়, তখন কিছু মানুষ নিজেদের উদ্যোগে সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করে। সুলতানা রহমানও তার প্ল্যাটফর্মে দলীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে অনেক কর্মী-সমর্থককে উজ্জীবিত করেছিলেন।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেখা যায়, সেই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিবর্তে তাকে নিয়েই সন্দেহ, অপবাদ এবং বিভ্রান্তির পরিবেশ তৈরি করা হয়। এই প্রবণতা নতুন নয়; বরং এটি সেই পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা, যেখানে ত্যাগীদের সম্মান দেওয়ার বদলে তাদেরই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।

এই ধরনের আচরণ একটি দলের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। হান্না আরেন্ট তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, যখন রাজনীতিতে সত্যের জায়গা দখল করে অপপ্রচার ও অবিশ্বাস, তখন পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সতর্কবার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

এই অবস্থায় নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমান কিংবা যে কোনো শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে মানুষের প্রত্যাশা-ত্যাগীদের মর্যাদা দেওয়া, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকা। কিন্তু যদি নেতৃত্ব এই জায়গায় ব্যর্থ হয়, তাহলে দলীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনসমর্থন ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।

আজ তৃণমূল পর্যায়ে যে নীরব ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই ক্ষোভ কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা এবং অবমূল্যায়নের ফল। মানুষ এখন বুঝতে শিখেছে-সুবিধাবাদী রাজনীতিকে সমর্থন করলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিজেরাই।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক গভীর সঙ্কটে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ-একটি হলো ত্যাগী কর্মীদের মর্যাদা দিয়ে নৈতিক ভিত্তির ওপর দলকে পুনর্গঠন করা; অন্যটি হলো সুবিধাবাদীদের হাতে দলকে সঁপে দিয়ে ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—যে দল তার ত্যাগীদের ভুলে যায়, সেই দলকে একসময় জনগণও ভুলে যায়।

মোঃ হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত