নিষিদ্ধ রাজনীতির ক্যাম্পাস ও মুক্তচিন্তার সংকট

শেয়ার করুন

ছাত্র রাজনীতি যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্ধ হয়ে যায়, তখন অনেকেই ধরে নেয়—সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। ক্যাম্পাস শান্ত, সংঘাত কম, পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক। এই নীরবতার ভেতরে যে আরেক ধরনের অদৃশ্য প্রবাহ জন্ম নিতে পারে, সেটা আমরা প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যাই।
এই দেশের ইতিহাস আমাদের ভিন্ন এক সত্য শিখিয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে ছিল সচেতন, সংগঠিত, প্রশ্ন করতে জানা এক ছাত্রসমাজ। সেই ধারাবাহিকতায় ছাত্র রাজনীতি কেবল ক্ষমতার খেলা নয়, বরং চিন্তার বিকাশ, মতের সংঘর্ষ আর অধিকার চেনার একটি প্রক্রিয়া।

কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়াটাকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন শূন্যতা তৈরি হয়। আর ইতিহাস বলে—শূন্যতা কখনোই খালি থাকে না। প্রকাশ্য রাজনীতির জায়গা যখন সংকুচিত হয়, তখন অপ্রকাশ্য শক্তিগুলো ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়। তারা কোনো ব্যানার নিয়ে আসে না, কোনো প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়ায় না, কিন্তু নীরবে প্রভাব বিস্তার করে। বন্ধ দরজার আড়ালে, অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর ভেতরে, ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিকতা গড়ে তোলে—যেখানে প্রশ্ন কম, অনুসরণ বেশি; যেখানে মুক্তচিন্তার বদলে তৈরি হয় একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি।

একজন শিক্ষার্থী তখন দ্বিধায় পড়ে যায়। তার সামনে খোলা কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই, যেখানে সে নিজের মত প্রকাশ করবে, তর্ক করবে, ভুল করবে, আবার শিখবে। ফলে সে হয় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, না হয় কোনো অদৃশ্য প্রভাবের ভেতরে ঢুকে পড়ে—যেখানে সে বুঝতেও পারে না, কীভাবে তার চিন্তার জগৎ সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে।

এটাই সবচেয়ে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর ঝুঁকি। কারণ প্রকাশ্য রাজনীতির ভুল, দুর্বলতা বা অপব্যবহার আমরা দেখতে পাই, সমালোচনা করতে পারি, পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারি। কিন্তু গোপন প্রভাবের কোনো জবাবদিহি নেই, কোনো দৃশ্যমান রূপ নেই। সেখানে নিয়ন্ত্রণ থাকে, কিন্তু প্রতিরোধের সুযোগ কমে যায়।

অর্থনৈতিক বা একাডেমিক স্থিতিশীলতার যুক্তিতে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত অনেক সময় সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়। কিন্তু যদি সেই সঙ্গে বিকল্প কোনো মুক্ত চিন্তার, অংশগ্রহণের, নেতৃত্ব গঠনের পথ তৈরি না করা হয়, তাহলে এই স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে এক ধরনের নীরব সংকটে পরিণত হয়। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চার জায়গা হলেও, চিন্তার বৈচিত্র্য হারাতে শুরু করে।
সাংস্কৃতিকভাবেও এর প্রভাব গভীর। ক্যাম্পাস তখন আর বিতর্কের, মতের লড়াইয়ের, সৃজনশীল উত্তেজনার জায়গা থাকে না; বরং ধীরে ধীরে একরৈখিক, নিরুত্তাপ পরিবেশে পরিণত হয়। আর যেখানে প্রশ্ন নেই, সেখানে সত্যের অনুসন্ধানও থেমে যায়।

তাই প্রশ্নটা কেবল ছাত্র রাজনীতি থাকবে কি থাকবে না—এখানে আটকে থাকলে চলবে না। আসল প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীরা কি নিজেদের মত প্রকাশের, সংগঠিত হওয়ার, নেতৃত্ব শেখার একটি নিরাপদ ও উন্মুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে? যদি না পায়, তাহলে সেই শূন্যস্থান কোনো না কোনো শক্তি পূরণ করবেই—প্রকাশ্যে না হোক, আড়ালে।

একটি সুস্থ শিক্ষাঙ্গন মানে শুধু সহিংসতামুক্ত পরিবেশ না, বরং এমন এক জায়গা যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, আলোচনার সুযোগ থাকবে। কারণ শেষ পর্যন্ত, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য শুধু তথ্য জানা না—চিন্তা করতে শেখা। আর সেই চিন্তার পথ বন্ধ হয়ে গেলে, নীরবতাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়।

মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত