১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫: ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক ষড়যন্ত্র ও জিয়াউর রহমানের উত্থান

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর—এই সময়টুকু কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রের ভেতরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, সামরিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আদর্শিক সংঘাতের এক জটিল অধ্যায়। এই সময়ের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ইতিহাসের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে হলে ১৫ আগস্টের সামরিক কাঠামো, ২৪ আগস্টের নিয়োগ, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এক গভীর ও ভয়াবহ অধ্যায়। কিন্তু এই ঘটনার পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস বুঝতে হলে সেদিন সেনাবাহিনীর দায়িত্বে কারা ছিলেন, তা আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ। উপপ্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমান এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ বা সিজিএসের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। অর্থাৎ সেদিন জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে ছিলেন না। সেনাপ্রধান হিসেবে সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডের দায়িত্ব ছিল শফিউল্লাহর হাতে। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফও সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ও সমন্বয়মূলক দায়িত্বে ছিলেন।

এই পদবিন্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে সেনাবাহিনীর তৎকালীন নেতৃত্ব কেন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি, সে প্রশ্নের জবাব ইতিহাসের কাছে অবশ্যই থাকতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের অভিযোগ তুলতে হলে তার পক্ষে নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণও প্রয়োজন। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, নীরবতা, রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া এবং হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় সরাসরি অংশগ্রহণ—এগুলো এক বিষয় নয়।

১৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। ২৪ আগস্ট জেনারেল শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয় এবং তাঁকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। অর্থাৎ ১৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসেন। এই নিয়োগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও এর পেছনের ক্ষমতার সমীকরণও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়।
এরপর আসে ৩ নভেম্বর। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটায়। জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়। খালেদ মোশাররফ সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। রাষ্ট্রপতি মোশতাকের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তখন প্রকাশ্য রূপ নেয়।

৩ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে কারাগারের ভেতরে হত্যা করা হয়। তাঁরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ চার ব্যক্তি। তাঁদের হত্যাকাণ্ড শুধু চারজন রাজনৈতিক নেতার প্রাণহানি নয়; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তির ওপর আরেকটি ভয়াবহ আঘাত।
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ১৫ আগস্টের হত্যাকারী সামরিক কর্মকর্তাদের যোগসূত্র, তাঁদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ এবং ৩ নভেম্বরের ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়েছে। তবে ঘটনার সময়ক্রম ও বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা বিশ্লেষণ না করে কোনো ব্যক্তির ওপর এককভাবে দায় চাপানো ইতিহাসচর্চার সঠিক পদ্ধতি হতে পারে না। অভিযোগ, সাক্ষ্য, দলিল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ান—সবকিছুকে আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও সেনাবাহিনীর ভেতরের অস্থিরতা থামেনি। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সেনানিবাসে সৈনিকদের মধ্যে ক্ষোভ, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং বিভিন্ন পক্ষের সংগঠিত তৎপরতা ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে অনিবার্য করে তোলে।

৭ নভেম্বর সংঘটিত হয় সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান। এই ঘটনায় জাসদের গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সংগঠিত ভূমিকার কথা ইতিহাসের বিভিন্ন বিবরণে উঠে এসেছে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডগুলোও ৭ নভেম্বরের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৭ নভেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাখ্যা এক নয়। বিএনপি দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে। অন্যদিকে জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের কাছে দিনটির তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা ভিন্ন। কিন্তু দলীয় ব্যাখ্যার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সৈনিকদের ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মিলিত বিস্ফোরণ। ঘটনাটিকে কেবল একজন ব্যক্তির একক নেতৃত্বে সংঘটিত ঘটনা হিসেবে দেখলে এর বহুমাত্রিক বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর এই রাজনৈতিক উত্থান ১৫ আগস্ট-পরবর্তী ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সম্পর্কিত—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোই ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে পূর্বপরিকল্পিত অংশগ্রহণের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না।
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়ে যায়: ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা ছিল? জিয়াউর রহমানের সঙ্গে অভ্যুত্থানকারীদের যোগাযোগ বা কথোপকথন নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ ও বিতর্ক থাকলেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া তাঁকে সরাসরি ষড়যন্ত্রের অংশীদার ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল ইতিহাসচর্চা নয়।

ইতিহাসের বিচার করতে হলে একই মানদণ্ড সবার জন্য প্রযোজ্য হতে হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দায়, জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড, সেনাবাহিনীর তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকা, খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণ, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড—প্রতিটি বিষয়ই দলীয় আবেগের বাইরে থেকে পর্যালোচনা করা জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। ইতিহাসকে নিজের পক্ষে সাজিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তাতে সত্য বদলে যায় না।
৭ নভেম্বর শুধু ক্ষমতার পালাবদলের দিন নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি কঠিন ঐতিহাসিক শিক্ষা। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক আস্থা নষ্ট হলে এবং সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে একটি দেশ কত দ্রুত অনিশ্চয়তার দিকে চলে যেতে পারে—১৯৭৫ সালের এই ঘটনাপ্রবাহ তারই নির্মম উদাহরণ।

ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে কাউকে অযথা দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না, আবার রাজনৈতিক বিদ্বেষ থেকে কাউকে অপরাধীও বানানো যাবে না। প্রয়োজন দলিল, প্রমাণ, যুক্তি এবং নির্মোহ বিশ্লেষণ। কারণ ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি বা দলের অবস্থান নয়, সত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা, জাতীয়তাবাদী ছাত্র দল ও প্রচার সম্পাদক ইতিহাস এলামনাই এসোসিয়েশন


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত