“গুপ্ত-সুপ্ত ও রাজনীতি “

শেয়ার করুন

দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা গভীরভাবে অনুধাবনের দাবি রাখে। তারেক রহমান আবেগতাড়িত রাজনীতিবিদ নন; বরং দীর্ঘ নির্বাসন, নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা। তাঁর প্রতিটি শব্দ, শব্দচয়নকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করাই যুক্তিসংগত।

‘সুপ্ত’ ও ‘গুপ্ত’—এই শব্দ কোনো ব্যক্তি বা আন্দোলনকে ছোট করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান বাস্তবতার প্রতিফলন। ফ্যাসিবাদী শাসনের দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে অনেক রাজনৈতিক শক্তি প্রকাশ্য রাজনীতি করতে না পেরে আত্মগোপনে বাধ্য হয়েছিল—এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে এই আত্মগোপনের সুযোগে নানা বিভ্রান্তিকর শক্তি, আদর্শগতভাবে অস্পষ্ট কিংবা দ্বিমুখী অবস্থান নেওয়া গোষ্ঠীও বিগত সরকারের রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় থেকে বিএনপি সহ রাজপথের দলগুলোর উপর হামলা মামলা করেছে। তারেক রহমানের বক্তব্য মূলত এই অস্পষ্টতা দূর করার আহ্বান—যেখানে রাজনীতি হবে স্বচ্ছ, প্রকাশ্য এবং জনগণের সামনে দায়বদ্ধ।

তারেক রহমান নিজে একজন মাজলুম নেতা। প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি দেশে ফিরতে পারেননি, মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়েছেন, তাঁর পরিবার ও দলের নেতা-কর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি রাজনীতিতে লুকোচুরি, দ্বিচারিতা কিংবা পরিচয় গোপন করে রাজনীতি করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছেন। এখানে কারও আত্মত্যাগ বা সংগ্রামকে অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই; বরং ভবিষ্যতের বাংলাদেশে রাজনীতি যেন আর কখনো কাউকে ‘গুপ্ত’ বা ‘সুপ্ত’ থাকতে বাধ্য না করে—সেই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে।

জুলাই আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণআন্দোলনে যারা সাহসিকতার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অনস্বীকার্য যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সকল শক্তিকে প্রকাশ্য রাজনীতির ছাতার নিচে আসতে হবে, স্পষ্ট পরিচয় ও আদর্শ নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তারেক রহমানের বক্তব্য সেই দিকনির্দেশনাই দেয়—এটি কোনো বিভাজনের ডাক নয়, বরং রাজনীতিকে আরও পরিণত ও প্রাতিষ্ঠানিক করার আহ্বান।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার বহনকারী এবং বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনে বেড়ে ওঠা তারেক রহমান বারবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদার ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের কথা বলেন, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু ষড়যন্ত্র নয়; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু গোপন রাজনীতি নয়।

এই প্রজন্ম তারেক রহমানের কাছে প্রতিশোধ নয়, পরিবর্তন দেখতে চায়। অতীতের ক্ষত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব দেখতে চায়। তাঁর বক্তব্যকে সেই পরিবর্তনের ভাষা হিসেবেই দেখা উচিত—যেখানে রাজনীতি হবে পরিষ্কার, সাহসী এবং জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ানো।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তারেক রহমানের ভূমিকা তাই কেবল একজন দলের নেতা হিসেবে নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত