সরকার সারাদেশে মানবিক চিকিৎসক তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে : মহাপরিচালক

শেয়ার করুন

আমরা স্বাস্থ্য শিক্ষার ক্ষেত্রে সবসময় বলি আমরা মানবিক চিকিৎসক চাই। ডা. রাসকিনের মতো যারা প্রাকটিস বাদ দিয়ে রোগটা যেন দ্রুত ধরা পড়ে তার জন্য কাজ করে তেমন চিকিৎসক চাই। আমরা প্রথমবারের মতো মানবিক চিকিৎসক তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছি। ভর্তি পরীক্ষায় এই বিষয়টা যুক্ত করেছি। শিক্ষার্থীদের কার মধ্যে এই ধরণের দয়া আছে তা যাচাই করা হবে। আমরা ভবিষ্যতে চাইব এই ধরণের ১০০টা প্রশ্ন থাকুক। শুধু মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে ভাল ডাক্তার পাওয়া যাবে না।

আজ বৃহস্পতিবার ডিআরইউ এর নারী সদস্য ও পরিবারের জন্য বিনামূল্যে ব্রেস্ট স্ক্রিনিং ক্যাম্পের উদ্বোধনকালে একথা বলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন সুমন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)’র উদ্যোগে শফিকুল কবির মিলনায়তনে এ স্ক্রিনিং ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সহযোগিতা করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

ডা. নাজমুল হোসেন সুমন বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রধান ঘাতক ব্যাধি এই ক্যান্সার। এটি যেহেতু রিপোর্টারদের আয়োজন আপনাদের মাধ্যমে কিছু কথা যদি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারি এরজন্য আমি আজ এখানে এসেছি। ২০২২ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ৬ লাখ ৭২ হাজার মানুষের ক্যান্সারে মৃত্যু ঘটেছিল। বাংলাদেশে ১২ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই তালিকাটা নারী জনগোষ্ঠীর। যারা আমাদের প্রতিপালন করেন শিক্ষা দেন তারা এই রোগে মৃত্যুবরণ করেছেন।ক্যান্সারের কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর আছে যেগুলো আমরা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলে ফেলতে পারি।

দেশে মেডিকেল শিক্ষায় নারীরা উন্নতি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা জেনে খুশি হবেন যে, আমাদের দেশের চিকিৎসাখাতে নারী শিক্ষায় নিরব বিপ্লব হয়ে গেছে। আমরা যখন মেডিকেলে পড়ি তখন ৩০ শতাংশ নারী মেডিকেলে পড়ত। এখন সেটা ৭০ শতাংশ। গতবছর এটা ছিল ৬৩ শতাংশ, ছেলেরা ৩৬ শতাংশ। আগে মেয়েরা কোটায় পড়ত। এখন স্বাভাবিকভাবে মেধাতে এগিয়ে গেছে। নারীরা সবচেয়ে বেশি এই ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হন। এখন তাদের কাজে যোগদানের হার বাড়ছে। স্তন্যদানের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ধর্মে শিশুকে ২ বছর পর্যন্ত স্তন্যদানে উৎসাহিত করা হয়েছে।

ক্যান্সার সচেতনতার গুরুত্ব ঊল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীরা কিছু নিয়ম পালন যেমন ওজন হ্রাস, ব্যায়াম করা, সক্রিয় থাকা, শারিরীক পরিশ্রম করার মাধ্যমে এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে। ধূমপানও অনেক বড় একটা কারণ। ধূমপান দুই ধরণের- ১. একটিভ, ২. প্যাসিভ। নারীরা প্যাসিভ স্মোকিংয়ের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ক্যান্সারের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। আমাদেরকে শুরুতেই এর প্রতিকার না প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি মাতৃস্তন্য পান করাই, স্থূলতা পরিহার করি এবং ধূমপান পরিহার করতে পারি এই রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারি। উন্নত বিশ্বে দ্রুত রোগটি ধরা পড়ায় সারভাইভারের হার বেশি। আমাদের দেশে স্ত্রিনিং প্রক্রিয়া অনেক সহজ। তাই, সবাইকে স্ক্রিনিংয়ের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।

মেডিকেল শিক্ষায় উন্নতির হওয়া জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেডিকেল শিক্ষায় উন্নতির জন্য মেডিকেল কলেজগুলো ভাল হওয়া দরকার। আমরা একটি বড় প্রজেক্টের উদ্যোগ নিয়েছি ১০ টি মেডিকেল কলেজে ১৯টি হোস্টেল নির্মাণ করা হবে।সেখানে ৮৯০০ জন শিক্ষার্থী থাকতে পারবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রতিবছর২২৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। এখানকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এটিকে আধুনিক উন্নতমানের কলেজ করার জন্য আমরা প্রস্তাব দিয়েছি একনেকে এটি পাস হলে আমরা তিন বছরের মধ্যে এই কলেজের পুরো অবয়ব পাল্টে ফেলব। আমরা পুরেনা ৮টি মেডিকেল কলেজকে আধুনিক করব। আমরা যদি মানবিক চিকিৎসক তৈরি করতে পারি তাহলে সবার জন্য স্বাস্থ্যটা নিশ্চিত করা যাবে।

প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমডি ডা. এম এ মুবিন খান বলেন, ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং একজন মানুষের জীবন রক্ষার প্রক্রিয়া। বছরে ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষ ক্যান্সারে মারা যায়। এরমধ্যে দেশে ১২ হাজার ৫০০ জন ক্যান্সারে মারা যায়। এরমধ্যে বাংলাদেশ ৬ হাজার ৭ জন নারী ব্রেস্ট ক্যান্সারে প্রতিবছর মারা যায়। আমরা বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যু রোধে পৃথিবীতে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই রোগের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। যা আমরা সচেতনতার মধ্য দিয়ে অর্জন করতে পারি।
গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও প্রিভেন্টিভ অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, আমরা যখন প্রথমদিকে স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করতে চাইতাম তখন অনেক অনুরোধ করে লোকজন যোগাড় করতে হত। এখন এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ক্যান্সারের কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর আছে। যেগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কিছু বিষয় আছে যেগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। জেন্ডার এই রোগের ক্ষেত্রে একটা ইস্যু। নারীর ১০০ভাগ ঝুঁকি বেশি। বয়স যত বাড়বে, ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বাড়বে। রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ গুরুত্বপূর্ণ মা এবং শিশু এখানে দুজন দুজনকে সাহায্য করতে পারে। যে নারীদের অল্প বয়সে মাসিক শুরু হয়, শেষ হয় দেরিতে তাদের ঝুঁকি বেশি। মায়েদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো খুব দরকার। শিশুকে শালদুধ খাওয়ালে মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। একজন নারী যত মুটিয়ে যাবে তার ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বাড়বে। জাংক ফুড, ফাস্ট ফুড খাওয়া ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। নারী যদি শারীরিক পরিশ্রম না করে মদপান করে, রেডিয়েশনের মধ্যে থাকে তাহলে তার ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।

তিনি বলেন, আমরা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৩০-৬৫ হাজার টাকার মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সারের অপারেশন করাচ্ছি। আপনারা রোগীদের পাঠাতে পারেন।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ বলেন, একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী শুধু নিজের জন্য না পরিবারের জন্য, দেশের জন্য বোঝা। আমরা আগে থেকে ক্যান্সারের বিষয়ে সচেতন হলে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাব।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ২০২২ সালে আমরা আমাদের সকল সদস্যকে হেপাটাইটিস বি এর টিকা দিয়েছি। আমরা সহকর্মীদের স্বাস্থ্যগত বিষয়ে সহযোগিতার অংশ হিসেবে আজকের এই আয়োজন করেছি। আমার মা খাদ্যনালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত। মা এখন আগের চেয়ে কিছুটা ভাল আছেন। আমি ছোটবেলায় যে বাড়িতে খেলতে যেতাম সেই বাড়ির ভাবির এই স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে। তৃতীয় স্টেজে। তখন তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি কিন্তু তাকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। এই কষ্টটা আমার মধ্যে রয়ে গেছে। শুধুমাত্র নারীর যে স্তন ক্যান্সার হয় বিষয়টি এমন নয়। পুরুষদেরও এই রোগ হয়। ৩৫ ঊর্ধ্ব নারীদের এই রোগ বেশি হচ্ছে। আমরা আমাদের বর্ধিত অংশে একটা হেলথ কর্নার করার চিন্তা করছি। আশা করি ভবিষ্যতে তা সদস্যদের জন্য করতে পারব।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির দপ্তর সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, স্তন ক্যান্সারের একজন রোগী আমি ঢাকা মেডিকেলে দীর্ঘদিন ঘুরেছি। আমি জানি এই রোগটা খুবই কষ্টদায়ক একটা রোগ। এই রোগ শুধু রোগীকে না একটা পুরো পরিবারকে শেষ করে দেয়।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নারী বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না বলেন, আমরা দায়িত্ব নেয়ার দেঢ় মাসের মাথঅয় আমরা এই আয়োজন করছি। শুধু বোনদের সচেতন করার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন করা হয়েছে। এতে যদি একজন নারী উপকৃত হন এতেই আমাদের লাভ। এসময় তিনি ডিআরইউ এর সাবেক নারী বিষয়ক সম্পাদক সুমি খানের ‘স্তন ক্যান্সারে মৃত্যুঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় স্কিনিং এবং সচেতনতা জরুরি’ বিষয়ক প্রবন্ধ পড়ে শোনান।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পাদক মাহমুদ সোহেল বলেন, আমরা এক বছরের জন্য যে দায়িত্ব পেয়েছি তা ভালোভাবে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি শুকুর আলী শুভ বলেন, এই ক্যান্সার স্ক্রিনিং আয়োজনটি পরিবারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা উদ্যৈাগ। ডিআরইউ তার সদস্যদের যেখানেই সমস্যা সেখানেই এগিয়ে আসে। এই ধারা অব্যাহত থাকুক।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সহ-সভাপতি মেহেদী আজাদ মাসুম। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। এসময় ডিআরইউ এর সাবেক নারী বিষয়ক সম্পাদক রোজিনা রোজী বক্তব্য রাখেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির কার্যনির্বাহী কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো: জাফর ইকবাল, প্রচার প্রকাশনা সম্পাদক মিজান চৌধুরী, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, কল্যাণ সম্পাদক রফিক মৃধা, কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন, দৈনিক বাংলাদেশের আলো পত্রিকার সম্পাদক মফিজুর রহমান বাবু, ডিআরইউ এর সদস্য জাহিদা ছন্দা, তাসকিনা ইয়াসমিন প্রমুখ। প্রমুখ।
দিনব্যাপী স্ক্রিনিং কার্যক্রমপরিচালনা করেন গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. রাসকিনসহ চারজন কর্মী ( চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ ও ড্রাইভার) অংশ নেন। এতে প্রায় ৫০ জন নারী স্ক্রিনিংয়ে অংশ নেন।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত