হাতিয়ায় ‘ধর্ষণ রাজনীতি’: একটি সাজানো ন্যারেটিভের ব্যবচ্ছেদ

শেয়ার করুন

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা–কে ঘিরে সাম্প্রতিক যে ধর্ষণ–আখ্যান ছড়ানো হয়েছে, সেটি আর নিছক একটি অভিযোগের বিষয় নয়—এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নির্মাণের উদাহরণ। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে দেখলে স্পষ্ট হয়, এখানে মানবিক ট্র্যাজেডির চেয়ে রাজনৈতিক হিসাবই বেশি সক্রিয়।

ঘটনার টাইমলাইন শুরু হয় শুক্রবার সন্ধ্যায়। প্রকল্প বাজার এলাকায় আব্দুর রহমান এনসিপি কর্মীদের হামলার শিকার হন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত আনুমানিক দশটার দিকে তিনি সেখানে মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে ভর্তি হন। অথচ অভিযোগকারী নারী দাবি করেন, ঠিক ওই রাত ১১টার সময় রহমান তাকে ধর্ষণ করেছে। একজন ব্যক্তি যখন জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তখন একই সময়ে হাতিয়ায় গিয়ে এমন অপরাধ সংঘটনের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পরদিন শনিবার সকালে ওই নারী শারীরিক আঘাতের কথা বলে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর হঠাৎ ধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসে। এখানেই পুরো ঘটনাটি রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। প্রথমে গণধর্ষণের দাবি, পরে বক্তব্য বদলে একক ধর্ষণের কথা—একই ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন বয়ান কেবল বিভ্রান্তিই নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবস্থানকেই ইঙ্গিত করে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তও এই সন্দেহকে শক্ত করে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, এটি মূলত জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ থেকে সৃষ্ট সংঘর্ষ—ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এএসপির নেতৃত্বে তদন্তকারী দল ঘটনাস্থল ঘুরে নিশ্চিত করেছে—শুক্রবার রাতে রহমান আহত হন এবং শনিবার সকালে আরেক দফা মারামারিতে ওই নারী আহত হন। ডাক্তারি পরীক্ষাতেও ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—তাহলে এত দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে “ধর্ষণ ইস্যু” কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে নির্বাচনী বাস্তবতায়। হাতিয়ায় এনসিপি নেতা আব্দুল হান্নান মাসুদ–এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির মাহবুবুর রহমান শামীম। নির্বাচনের পরপরই এলাকায় পাল্টাপাল্টি হামলা, বাড়িঘর ও রাজনৈতিক অফিস ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে একটি নারীকে সামনে এনে ধর্ষণের গল্প দাঁড় করানো হয়েছে—যাতে আগের সহিংসতার দায় চাপা পড়ে এবং আবেগী সমর্থন তৈরি করা যায়।

রাজনীতিতে এটি পরিচিত কৌশল। মাঠের বাস্তবতায় কোণঠাসা হলে অনেক পক্ষই নৈতিক উচ্চভূমি দখলের চেষ্টা করে। নারী নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ইস্যুকে ঢাল বানিয়ে প্রতিপক্ষকে দানব হিসেবে উপস্থাপন করা এবং নিজেকে ভিকটিম সাজানো—এই ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরনো ছকই অনুসরণ করছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এতে প্রকৃত নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ধর্ষণের অভিযোগ ব্যবহার করা মানে ভবিষ্যতে সত্যিকারের ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের পথ আরও কঠিন করে দেওয়া।
একসময় জুলাই আন্দোলনের মুখ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে মানুষ নৈতিক রাজনীতির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে অনেকেই বদলে যায়—হাতিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই তিক্ত সত্যই সামনে আনছে।

উপসংহার স্পষ্ট: এটি কোনো স্বাভাবিক ধর্ষণ মামলা নয়; এটি একটি সাজানো রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা। মিথ্যা দিয়ে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করা যায়, কিন্তু সত্য দীর্ঘদিন চাপা থাকে না। হাতিয়ার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি যদি মানবিক ট্র্যাজেডিকে অস্ত্র বানায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল প্রতিপক্ষ নয়, পুরো সমাজ।

মো: হাফিজ আল আসাদ , রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত