দেশের অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দৃঢ় অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর
ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দ্রুত দেশে ফেরত আনার বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের করভার লাঘব, কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং দেশীয় শিল্প ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষার প্রসারে একাধিক জনবান্ধব সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন প্রধানমন্ত্রী।
সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হলেও প্রধানমন্ত্রী তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুরোধ জানান। একইভাবে ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য তা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেন।
তিনি কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহার করার বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
দেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতের উন্নয়নেও প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর প্রযোজ্য ১০ শতাংশ কর হ্রাস করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। তবে একই সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদার করা, শিক্ষার্থীদের বহু ভাষায় পারদর্শী করতে ল্যাংগুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে অভিনন্দন জানান।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বিকাশের লক্ষ্যে পার্বত্য তিন জেলায় তাদের পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকা-ের আয়ের পাশাপাশি পাহাড়ি ও সমতল উভয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত ব্যক্তিদের বেতনভোগী আয়কেও করমুক্ত করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও আমদানি শুল্ক হ্রাসের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। দেশের চিংড়ি চাষের প্রসার ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে একিউফিড, ফিড এডিটিভস, প্রোবায়োটিক্স, ভিটামিন ও মিনারেলস আমদানিতে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।
এছাড়া তিনি স্থানীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান, ওষুধ ও স্থানীয় শিল্পে ব্যবহৃত মধু আমদানির ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং পিভিসি ও পেট রেজিন আমদানির প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। তিনি ফায়ার ডোর উৎপাদনের কাঁচামাল কোল্ড রোল্ড শিট আমদানির ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং ফ্ল্যাট রোল্ড প্রোডাক্ট আমদানির ১০ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান ।
বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের রিফাইন কপার আমদানির ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ক্যাশনাট প্রসেসিং শিল্পের কাঁচামাল অপ্রক্রিয়াজাত বাদাম আমদানির কাস্টমস শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ছবি : পিএমও
ছবি : পিএমও
স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প এবং প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত করার অনুরোধ জানান তিনি।
ব্যবসায়ীবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে স্বর্ণ, ডায়মন্ড ও রৌপ্য অলংকারের ভ্যাটের হার পুনর্নির্ধারণ, বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রচারণায় বহুল ব্যবহৃত ডাবল কেবিন পিকআপ এবং মাইক্রোবাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্রিল্যান্সার এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমান সরকার একটি বিশাল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মত সরকার বাজেটে স্টার্টআপ ফান্ডিং এর জন্য ৫শ কোটি টাকার একটি বাজেট রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই ফান্ড ব্যবহার করে আমাদের তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যাওয়ার একটি অবারিত সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান নয়, স্টার্টআপ প্রজেক্ট সফল হলে দেশের তরুণ প্রজন্মের সামনে এক বিশাল কর্মসংস্থানের স্পেস তৈরি হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেট প্লেস এবং অন্যান্য অনলাইন মিডিয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করে থাকেন। এসবের মাধ্যমে বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ থাকায় অনেক সময় দেখা গেছে, ব্যবসায়ীগণ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ না করে অন্যভাবে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে অর্থগুলো পরিশোধ করে থাকেন। ফলে ওই ব্যক্তির যেমন লাভ হচ্ছে না, একই দিকে সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে আরোপিত ১৫ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার অনুরোধ জানান।
ব্যবসায়ীবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে স্বর্ণ, ডায়মন্ড ও রৌপ্য অলংকারের ভ্যাটের হার পুনর্নির্ধারণ, বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রচারণায় বহুল ব্যবহৃত ডাবল কেবিন পিকআপ এবং মাইক্রোবাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এমনকি আদর্শহারে ভ্যাট প্রদানে সহজীকরণের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কো-এফিশিয়েন্ট দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান সংসদ নেতা।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সাইকেলের ওপর সকল শুল্প প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এই মাত্র বিরোধীদলের নেতা ওনাদের অবস্থান থেকে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছেন। আমি এই প্রস্তাবটির সকল কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যতটুকু বিবেচনা করা যায়, তা করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এর আগে সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট বক্তব্যের প্রথমে অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
