বাংলাদেশের অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা ও আমাদের আবেগের দ্বন্দ্ব
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ হলো মধ্যপ্রাচ্য। আমাদের লাখো প্রবাসী ভাই প্রতিদিন ঘাম ঝরাচ্ছেন Saudi Arabia, United Arab Emirates, Qatar, Kuwait, Omanসহ বিভিন্ন দেশে। তাদের পাঠানো কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সে আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্ত হয়, গ্রামের ভাঙা ঘর পাকা হয়, সন্তানের পড়াশোনা চলে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি রাজনৈতিক উত্তেজনা আমাদের অর্থনীতির সাথেও সরাসরি জড়িত।
একই সঙ্গে, মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের মানুষের হৃদয়ে আলাদা এক আবেগ আছে Iran-এর প্রতি। ইতিহাস, ধর্মীয় অনুভূতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান অনেকের কাছে মর্যাদা ও প্রতিরোধের প্রতীক। কিন্তু বাস্তবতা আবেগের চেয়ে কঠিন।
অনেকে প্রশ্ন তোলেন—ইরান কি চাইলে একাই বড় যুদ্ধ শুরু করতে পারত, বিশেষ করে Israel-এর বিরুদ্ধে? বাস্তব উত্তর হলো—না। কারণ এই সংঘাত শুধু দুই দেশের নয়। এর পেছনে রয়েছে বড় শক্তির জোট, সামরিক ঘাঁটি, প্রতিরক্ষা চুক্তি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ ইতিহাস। মধ্যপ্রাচ্যের বহু আরব রাষ্ট্রে পশ্চিমা শক্তির উপস্থিতি রয়েছে। ফলে এককভাবে যুদ্ধ মানে বৃহত্তর শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া।
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার চাপে। সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চালানো তাদের জন্য টেকসই হতো না। তাই তারা বহুদিন ধরে “বহুমুখী প্রতিরোধ” নীতি অনুসরণ করে—সরাসরি সংঘর্ষের বদলে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখা। এটি সাহসের প্রকাশ হতে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কৌশল।
এই জটিল বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক আবেগময় দ্বিধায় পড়ে যায়। একদিকে ইরানের প্রতি ভালোবাসা, অন্যদিকে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা—কারণ সেখানেই আমাদের মানুষ কাজ করে, জীবন গড়ে। তাদের নিরাপত্তা, সম্মান ও কর্মসংস্থান আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
যুদ্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু রাষ্ট্র নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রবাসী শ্রমিকের ভবিষ্যৎ, তার পরিবারের স্বপ্ন। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা মানে আমাদের রেমিট্যান্সে চাপ, অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, অসংখ্য পরিবারের জীবনে দুশ্চিন্তা।
তাই আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত মানবিক ও বাস্তবভিত্তিক। আমরা শান্তি চাই—কারণ শান্তিই আমাদের অর্থনীতির শক্তি, আমাদের প্রবাসীদের নিরাপত্তা, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিশ্চয়তা। আবেগ আমাদের হৃদয়ে থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ভাবতে হবে স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের কথা।
শেষ কথা হলো—ভূরাজনীতি বড় শক্তির খেলা হলেও তার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্য কেবল কৌশলগত মানচিত্র নয়; এটি আমাদের রুটি-রুজি, আমাদের আবেগ, আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাই আমাদের প্রার্থনা একটাই—সংঘাত নয়, শান্তি; বিভাজন নয়, ঐক্য; যুদ্ধ নয়, মানবিকতার
মোঃ হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
