বিদ্যুৎ অপচয়, অনলাইন বনাম শ্রেণিকক্ষ

শেয়ার করুন

বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি সংকটকে আমরা প্রায়ই উৎপাদন বা সরবরাহের ঘাটতি হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সংকটের বড় একটি অংশ সৃষ্টি হয় ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা থেকে। একই কাজ যদি কম শক্তি ব্যয়ে করা যায়, তাহলে সেটিই টেকসই পথ। শিক্ষা খাতে এই বিষয় একটি উদাহরণ তুলে ধরছি—বিশেষ করে অনলাইন ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার তুলনায়।

ধরা যাক, ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। প্রতি শ্রেণিকক্ষে ৫০ জন করে শিক্ষার্থী থাকলে মোট ৪০০টি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন। প্রতিটি কক্ষে গড়ে তিনটি ফ্যান ব্যবহার করলে মোট ফ্যানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০০টি। প্রতিটি ফ্যান যদি গড়ে ৬০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে, তাহলে মোট বিদ্যুৎ খরচ হয় ৭২ কিলোওয়াট বা প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ৭২ ইউনিট। অর্থাৎ, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে অত্যন্ত সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে, একই সংখ্যক শিক্ষার্থী যদি অনলাইন ক্লাসে অংশ নেয়, তাহলে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে মোবাইল বা ল্যাপটপ, একটি ফ্যান, এবং অনেক ক্ষেত্রে একটি এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহৃত হয়। এতে করে বিদ্যুৎ খরচ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ঘণ্টায় এই খরচ ১১ হাজার ইউনিটেরও বেশি হতে পারে—যা শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ১৫০ গুণ বেশি।

এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো “শেয়ারিং এফিসিয়েন্সি”। বিদ্যালয়ে একটি ফ্যান বা একটি অবকাঠামো বহু শিক্ষার্থীর মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে অনলাইন ব্যবস্থায় প্রতিটি শিক্ষার্থী আলাদা আলাদা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা জাতীয় পর্যায়ে বিশাল চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানি করা জ্বালানির ওপর। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা মানেই বেশি তেল ও জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে জ্বালানি বাজার অস্থির এবং দাম অনিশ্চিত, সেখানে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার একটি কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।
অবশ্যই অনলাইন শিক্ষার কিছু সুবিধা রয়েছে। দূরবর্তী অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা, জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা, কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি—এসব ক্ষেত্রে অনলাইন শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এটিকে যদি মূলধারার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে তা জ্বালানি দক্ষতার দৃষ্টিকোণ থেকে টেকসই নয়।

অতএব, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য বাস্তবসম্মত পথ হলো—শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাকে প্রধান ধারা হিসেবে রাখা এবং অনলাইন ব্যবস্থাকে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। এতে করে একদিকে যেমন জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে শিক্ষা ব্যবস্থাও হবে অধিক কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু শিক্ষার নয়—এটি আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন।

মো: হাফিজ আল আসাদ ,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত