এসিআই’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মিলু কোটি টাকা হাতিয়ে নিরুদ্দেশ, দায় নিচ্ছে না কেউ
শীর্ষ কর্পোরেট ব্র্যান্ড এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) জনসংযোগ বিভাগের এক কর্মকর্তা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। প্রায় ৬ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বিনিময় করে আগাম কোটি কোটি টাকার কমিশন নেন তিনি।
জানা গেছে, সম্প্রতি পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলু নিরুদ্দেশ হওয়াকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর চলতে থাকা অনিয়মের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির টপ লেবেলের একজনের পরোক্ষ মদদ এবং পলাতক কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি ‘গুপ্ত কমিশন সিন্ডিকেট’ গত অর্ধযুগ ধরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বিনিময় করে কোটি কোটি টাকা কমিশন হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র মতে, দেশের শতাধিক সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক-প্রতিনিধির কাছ থেকে বিজ্ঞাপন দেয়ার শর্তে প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে সম্প্রতি দেশ ছেড়েছেন সিন্ডিকেটের মূল হোতা। গণমাধ্যমের মালিক-প্রতিনিধির সাথে অফিস/অফিসের বাইরে, হোটেল/রেস্তরায় বসে চুক্তি করতেন পলাতক ওই ব্যক্তি। লাখে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা অগ্রীম কমিশন পেলেই বিখ্যাত কিংবা অখ্যাত যেকোন গণমাধ্যমকেই বিজ্ঞাপনের কার্যাদেশ দিতেন তিনি। আর এভাবেই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র কমিশন বাণিজ্য করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি-গাড়ি-প্লটের মালিক হয়েছেন এসিআই’র ‘গুপ্ত কমিশন সিন্ডিকেট’ সদস্যরা!
অভিযোগের কেন্দ্রে যে কর্মকর্তা
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘ ছয় বছর এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) ম্যানেজার (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) পদে দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলু। জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং আঞ্চলিক মিডিয়াগুলোতে বিজ্ঞাপন বরাদ্দের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞাপন পেতে হলে নির্দিষ্ট হারে অগ্রীম কমিশন দিতে হতো মিলুকে। এই কমিশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পিআরডির আরও কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। এভাবে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নেয়া কমিশনের প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে গত ৮ মার্চ গোপনে নিরুদ্দেশ হয়েছেন কামরুজ্জামান মিলু। তবে চক্রের ‘মূল হোতা’ পালিয়ে গেলেও নেতাসহ বাকী সদস্যরা এখনও স্বপদে বহাল আছেন।
জানা গেছে, করোনাকালীন সময়ে (২০২০ সালের দিকে) এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডে (স্বপ্ন) পি আর অ্যান্ড মিডিয়া ম্যানেজার পদে যোগদান করেন কামরুজ্জামান মিলু। এরপর থেকেই স্বপ্ন’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও সাব্বির হাসান নাসিরের অশীর্বাদপুষ্ট হয়ে জনসংযোগ শাখায় একটি শক্তিশালী ‘গুপ্ত কমিশন সিন্ডিকেট’ তৈরি করেন তিনি। মিলুকে নাকি ‘ভাইয়া’ বলে ডাকতেন নাসির! মিলুর নেতৃত্বেই বিভিন্ন সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে বিজ্ঞাপন দিয়ে কোটি কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করেছেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। আর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতার কারনে মিলুকে সবাই বিশ্বাস করতেন। মিলুর ফোনেই লাখ লাখ টাকা দিয়ে দিতেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী একাধিক বিজ্ঞাপনী সংস্থা, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, “বছরব্যাপী ক্যাম্পেইনের কথা বলে চলতি বছরের শুরুর দিকে তাদেরকে মোটা অংকের বিজ্ঞাপনের অফার (প্রস্তাব) দেন কামরুজ্জামান মিলু। আর এর জন্য বসদেরকে অগ্রীম পেমেন্ট করতে হবে বলে জানান তিনি। মিলুর প্রস্তাবে যারাই রাজি হয়েছেন; তাদেরকে ৩ থেকে ৩০ লাখ, ক্ষেত্র বিশেষে আরও বেশি মূল্যমানের কার্যাদেশ দেয়া হয়। আর কমিশনের টাকা ক্যাশ, বিকাশ, নগদসহ কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অগ্রীম পরিশোধ করেন ভুক্তভোগীরা। এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক চলছিলো। তবে গত ৮ মার্চ কাউকে কিছু না বলে নিরুদ্দেশ হয়েছেন কমিশন সিন্ডিকেটের হোতা কামরুজ্জামান মিলু। ‘বিভিন্ন জনের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে মিলু পালিয়েছে’- এমন কথা ছড়ালে ভুক্তভোগীরা মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যমে মিলুর খবর জানার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে মিলুর খোঁজে এসিআই’র তেজগাঁও কার্যালয়ে (নভো টাওয়ার) ভীড় জমাতে থাকেন ভুক্তভোগীরা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দেশের প্রায় পঞ্চাশের অধিক সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রতিনিধি-মালিক তাদের পাওনার জন্য এসিআই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে মিলুর অপকর্মের দায় নিতে চাচ্ছে না এসিআই কর্তৃপক্ষ। উল্টো কমিশন বাণিজ্যের সাথে জড়িত অপর কর্মকর্তাদের বাঁচাতে শুধুমাত্র মিলুকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে স্বপ্ন। এভাবে আড়াই মাস গত হতে চললেও ভুক্তভোগিদের টাকা ফেরতের কোন আশ্বাস দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।”
যা বলছেন ভুক্তভোগীরা
একাধিক গণমাধ্যমের ভুক্তভোগী প্রতিনিধিরা একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ (এসিআই) এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিআই লজিস্টিক্স লিমিটেডের (স্বপ্ন) সাথে দীর্ঘবছর যাবত বিজ্ঞাপনের ব্যবসা করছেন তারা। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির পলাতক কর্মকর্তা কামরুজ্জামান মিলু বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল করতেন। প্রতিষ্ঠানে তালিকাভূক্তি থেকে শুরু করে, কার্যাদেশ প্রদান, বিল প্রাপ্তির বিষয়গুলো সরাসরি মিলু তদারকি করতেন। আর নেপথ্যে থেকে মিলুকে সাপোর্ট দিতেন চক্রের বাকি সদস্যরা। স্বপ্ন’র যেকোন ক্যম্পেইনের বিজ্ঞাপন, ঈদ-পূজা কিংবা অন্য যেকোন উৎসব ঘিরে বিজ্ঞাপন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কমিশন বাবদ লাখে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা অগ্রীম দিতে হতো মিলু সিন্ডিকেটকে। কমিশনের টাকা নগদ, বিকাশ কিংবা ব্যাংকের মাধ্যমেই পরিশোধ করা হতো। চুক্তির শুরুতেই ‘বসদের ম্যানেজ করতে হবে’- বলেই কমিশনের টাকা সবসময় অগ্রীম নিতেন মিলু। বিজ্ঞাপনের রেট যতো বড়, কমিশনও দিতে হতো ততো বেশী। যারা অগ্রীম দিতেন তাদেরকে স্বপ্ন’র প্যাডে মিলুর স্বাক্ষরে মোটা অংকের কার্যাদেশ দেয়া হতো। কখনও সরাসরি কিংবা ই-মেইলে কার্যাদেশ পাঠাতেন মিলু। মিলু স্বাক্ষরিত কার্যাদেশের বিপরীতে বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই পে-অর্ডার/চেকের মাধ্যমে বিল পেয়েছেন। মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিলের অংক পাঠিয়ে দিতেন মিলু। এভাবেই গত প্রায় ছয় বছরেরও অধিক সময় কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন লেনদেনের মাধ্যমে বিভন্ন গণমাধ্যমের মালিক-প্রতিনিধি নিজেরা যেমন লাভবান হয়েছেন, তেমনি কমিশন বাবদ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মিলু সিন্ডিকেট।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য- “সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো। অগ্রীম ২৫/৩০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে হলেও বিজ্ঞাপনের অংকটা সবসময় স্বাস্থ্যসম্মত ছিলো। এভাবে গত কয়েক বছর যাবত সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের মালিক-প্রতিনিধিরা স্বপ্ন হতে নিয়মিত বিরতিতে মোটা অংকের চেক তুলছিলেন। মাঝেমধ্যে চেক প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রীতা ঘটলেও অধিকাংশই এসিআইয়ের বিজ্ঞাপনের অপেক্ষায় থাকতেন। তবে, গত ৮ মার্চ হঠাৎ করে মিলু উধাও হয়ে গেলে বিপত্তি দেখা দেয়। খবর ছড়ায়-বিভিন্ন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে মিলু দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তখন ভুক্তভোগীদের অনেকেই মিলুর খবর জানতে তার মোবাইলে কল দিয়ে বন্ধ পান। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে নক দিয়ে সাড়া না পেয়ে খোঁজখবর নিয়ে মিলুর নিরুদ্দেশ হবার খবরটি সঠিক বলে ধরে নেন সবাই।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদ্য সম্প্রচারে আসা একজন বলেন, “মিলুর সঙ্গে আমার এক বছরের একটি বিজ্ঞাপন চুক্তি হয়েছে। মাসে নিট পঞ্চাশ হাজার টাকা হিসেবে আমাকে মোট ছয় লাখ টাকার ওয়ার্ক অর্ডার দিয়েছে মিলু। ৬ লাখের ৩০ শতাংশ কমিশন বাবদ মোট এক লাখ আশি হাজার টাকা বিকাশ এবং মিলুর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অগ্রীম পরিশোধ করেছি- যার প্রমাণ আছে। আামার নিউজ পোর্টালে এখনও স্বপ্ন’র বিজ্ঞাপনগুলো শোভা পাচ্ছে।”
তবে চুক্তির মাত্র ১৫ দিন না পেরাতেই এক সহকর্মীর কাছে মিলুর পালিয়ে যাওয়ার খবর জানতে পারেন ভুক্তভোগী। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে কল দিয়ে মিলুর সবক’টা নাম্বার বন্ধ পান তিনি। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে মিলুর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে এখন পর্যন্ত কোন হদিস না পেয়ে সম্প্রতি এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) লিড-মার্কেটিং বাজেট অ্যান্ড কমিউনিকেশন অপারেশন্স মোঃ আতিকুর রহমানের সাখে সরাসরি দেখা করে তাকে বিষয়টি অবহিত করলে ভুক্তভোগীকে আতিক বলেন, ‘কামরুজ্জামান মিলুর অপকর্মের দায় এসিআই নিবে না। আপনি বিলের আশা ছেড়ে দিতে পারেন।’ আতিকের এমন প্রতিক্রিয়ামূলক জবাবে যারপরনাই হতাশা ব্যাক্ত করে তিনি বলেন, “বিজ্ঞাপনের বিলতো গেছেই, উল্টো পকেট থেকে এক লাখ আশি হাজার টাকা নগদ লোকসান দিলাম।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও একটি নিউজ পোর্টালের সম্পাদক বলেন, “স্বপ্ন’র বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হারে কমিশন দিতে হয়। কার্যাদেশ বুঝে পাবার আগেই কমিশন দেয়া লাগে। কমিশনের টাকা সবসময় মিলুর হাতেই দিতাম। ২০২৫ সালে মিলুর সাথে পরিচয়ের পর থেকেই আমার পোর্টালে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিতেন তিনি। ইতোমধ্যে আমার নিউজ পোর্টালে প্রায় ৭ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন পাবলিশ করেছি এবং তিন লাখ টাকার মতো বিল তুলেছি। এখনও স্বপ্ন’র কাছে চার লাখ টাকার বিল পাওনা আছে। এরই মধ্যে চলতি বছর জানুয়ারিতে বছরব্যাপী ক্যাম্পেইনের কথা বলে আমাকে মোট ১৬ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দেয়ার আশ্বাস দেন কামরুজ্জামান মিলু। আমি তাকে তিন ধাপে কমিশনের চার লাখ আশি হাজার টাকা পরিশোধ করি। এখনতো দেখছি চালান-পুঁজি সবই শেষ। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সমাধানের উদ্দেশ্যে কয়েকদফা এসিআই’র তেজগাঁও কার্যালয়ে গিয়েছি। বর্তমানে মিডিয়া কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা আতিকুর রহমান এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা মাসুম বিল্লাহকেও বিষয়টি জানিয়েছি। তারা শুধুই শুনছেন। কিন্তু কেউ-ই কোন সহযোগিতা করছেন না।”
একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম বরাবরের মতো এটাও অফিসিয়াল প্রসেসের অংশ। পরে বুঝেছি পুরো বিষয়টি ছিল মিলু সিন্ডিকেটের দীর্ঘ মেয়াদে প্রতারণা- যারা এসিআই’র মতো একটি বহুল পরিচিত কোম্পানীর চেয়ারে বসে বছরের পর বছর শুধুমাত্র কমিশন বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অথচ এখন প্রতিষ্ঠানের কেউই মিলুর দায় নিচ্ছে না। ৮টি পত্রিকায় ৩৬ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন কার্যাদেশের বিপরীতে আমার কাছ থেকে অগ্রীম কমিশন বাবদ তিন ধাপে ৯ লাখ টাকা নিয়েছেন মিলু।”
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, “বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য গোপনে নতুন করে কমিশন বা ‘পার্সেন্টেজ’ দাবি করা হচ্ছে। যারা এই শর্তে রাজি হয়েছেন, তারা নতুন বিজ্ঞাপন বা আংশিক বিল পাচ্ছেন। অন্যদিকে যারা আপত্তি তুলছেন, তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক অজুহাতে অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে।”
সিইওর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
ভুক্তভোগীদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও সাব্বির আহমেদ নাসিরের নীরব সমর্থন বা প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় ছাড়া কামরুজ্জামান মিলুর একার পক্ষে এত বড় পরিসরে কমিশনভিত্তিক অনিয়ম পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। তাদের দাবি, বছরের পর বছর এ ধরনের অনৈতিক লেনদেন চললেও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অডিট, ফিন্যান্স ও প্রশাসন বিভাগ কার্যকর কোনো নজরদারি করেনি। ফলে পুরো প্রক্রিয়া একটি “ওপেন সিক্রেট”-এ পরিণত হয়েছিল। তবে সিইও বা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
এ বিষয়ে সাব্বির আহমেদ নাসিরের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে (০১৯৭৩…৭৪৯) একাধিকবার কল দিলেও নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া গেছে। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি রিপ্লাই দেন নাই। সরাসরি সাক্ষাতের জন্য কয়েকদফা এসিআই’র তেজগাঁও অফিসে গিয়েও দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও তাঁর দেখা মেলেনি।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মিলুর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বপ্ন
এদিকে কামরুজ্জামান মিলু নিরুদ্দেশ হওয়ার কিছুদিন পর একটি তদন্ত কমিটি করে হাতেগোনা কয়েকটি গণমাধ্যমে দায়সারা নোটিশ দিয়েছে এসিআই কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনটি হুবহু সময়নিউজ পাঠক এবং ভুক্তভোগীদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো-
“আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, এ. সি. আই. লজিস্টিকস লিমিটেড (স্বপ্ন) বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ সেবামূলক রিটেইল চেইন। যে কোনো পরিস্থিতিতে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই যাত্রায় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইনসহ সকল গণমাধ্যমের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
স্বপ্ন সবসময়ই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কর্পোরেট সুশাসনের নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ প্রেক্ষিতে সম্প্রতি একটি প্রশাসনিক বিষয় সম্পর্কে সকলকে অবহিত করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করছি।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলু, মিডিয়া অ্যান্ড পিআর ম্যানেজার, গত ০৮/০৩/২০২৬ তারিখে ইমেইলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মানবসম্পদ বিভাগকে অবহিত করে পদত্যাগপত্র প্রদান করেন এবং পরবর্তীতে দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পরবর্তীতে তার দায়িত্বকালীন সময়ে সংঘটিত সম্ভাব্য কিছু আর্থিক অসংগতির অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্য প্রাপ্ত হওয়ায় এ. সি. আই. লজিস্টিকস লিমিটেড (স্বপ্ন) বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের রমজান মাসে স্বপ্ন-এর তেজগাঁও কার্যালয়ে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্বপ্ন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় স্বপ্ন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির উপস্থিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের জানান যে, স্বপ্ন-এর বিজ্ঞাপন ও জনসংযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে মোঃ আতিকুর রহমান, লিড-মার্কেটিং বাজেট অ্যান্ড কমিউনিকেশন অপারেশন্স, অথবা মোঃ মাহাদী ফয়সাল, ডেপুটি ডিরেক্টর, ক্যাটাগরি গ্রোথ অ্যান্ড ইএসজি-এর সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এ প্রেক্ষিতে স্বপ্ন সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন, জনসংযোগ বা এ ধরনের যে কোনো বিষয়ে তথ্য বা প্রয়োজনীয় যোগাযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে পুনরায় অনুরোধ করা হচ্ছে যে, তারা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলুর সাথে যোগাযোগ না করে নিচে উল্লেখিত প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করবেন।
তবে মজার বিষয় হচ্ছে- কামরুজ্জামান মিলু পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অর্ধশত গণমাধ্যমের মালিক-প্রতিনিধি তাদের ক্ষতিপূরণে এসিআই সংশ্লিষ্টদের সাথে বিভিন্নভাবে একাধিকবার যোগাযোগ করেও প্রকৃতপক্ষে কার্যকর কোন সমাধানে আসতে পারেন নি।
স্বপ্ন’র অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, “কেবলমাত্র জনসংযোগ বিভাগেই নয়, এসিআই’র প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টেই ‘কমিশন সিন্ডিকেট’ আছে। বিশেষ করে সারাদেশে স্বপ্ন’র সুপারসপগুলোতে বিভিন্ন পন্য সরবরাহকারী ভেন্ডর/ঠিকাদারদের সাথেও বছরের পর বছর মোটা অংকের কমিশন লেনদেন করে আসছে সংশ্লিষ্ট আরেকটি ‘সিন্ডিকেট’। যে কারনে স্বপ্ন’র অধিকাংশ আউটলেটে মানসম্মত পণ্যের ঘাটতি থাকে সবসময়। বিশেষ করে মাছ, মাংস, সবজি এবং ফলের গুণগত মান নিয়ে প্রায়ই আউটলেট কর্মচারীদের সাথে ক্রেতাদের বাক-বিতন্ডার ঘটনাও ঘটে।”
