শহীদ জিয়ার ৪৫ বছর: স্মৃতি, রাষ্ট্রদর্শন ও বাংলাদেশের অসমাপ্ত বিতর্ক
আজ বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত এবং একইসাথে প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তিনি। মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় পরিচয় ও ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে যেকোনো বড় আলোচনায় তাঁর নাম অনিবার্যভাবে ফিরে আসে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”—যা ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রিক পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঐক্যের ধারণা নির্মাণের চেষ্টা করে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ছিল অস্বাভাবিক সময়ের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানো তাঁর যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অস্থির রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দিশাহীন মানুষকে সংগঠিত করেছিল—এমন বিশ্বাস দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও গভীরভাবে প্রোথিত।
রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তিনি বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করেন, সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত বহু নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ধারায় ফেরানোর উদ্যোগ নেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার কাঠামোকে কার্যকর করার রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ে। উপজেলা ব্যবস্থার ধারণাগত ভিত্তিও তাঁর সময়েই দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে জিয়ার সময়কালকে অনেক বিশ্লেষক “রাষ্ট্রনির্ভর সমাজতন্ত্র থেকে নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ”-এর সূচনা পর্ব হিসেবে বিবেচনা করেন। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে খাল খনন কর্মসূচি, সেচ সম্প্রসারণ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য ছিল তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারে। একইসাথে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত অকার্যকর শিল্পনীতির বিকল্প হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
জিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত অবদান ছিল প্রবাসী শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কূটনৈতিক উদ্যোগ। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি জনশক্তি প্রবেশের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তাঁর সময়েই শক্তিশালী হতে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির যে বিশাল কাঠামো, তার প্রাথমিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি নির্মাণেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর উদ্যোগেই পরবর্তীতে গড়ে ওঠে সার্ক (SAARC)। দক্ষিণ এশিয়ার বৈরিতাপূর্ণ ভূরাজনীতির মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার যে ধারণা আজও প্রাসঙ্গিক, তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন তিনি। একইসাথে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে আলাদা মাত্রা দেয়।
শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রচিন্তাতেও তিনি কিছু প্রতীকী পদক্ষেপ নেন। “একুশে পদক” ও “স্বাধীনতা পুরস্কার” রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে তাঁর সময়েই। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নীতিও তাঁর আমলে দৃশ্যমান হয়।
২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি” জরিপে তিনি ১৯তম স্থান লাভ করেন। এটি কেবল জনপ্রিয়তার প্রতীক নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতি কতটা বিভক্ত ও বহুমাত্রিক—তারও প্রতিফলন।
তবে একটি বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানকে ঘিরে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মারকচর্চা কেন তুলনামূলকভাবে দুর্বল? বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী বা রাষ্ট্রদর্শনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, আর্কাইভ নির্মাণ, আন্তর্জাতিক সেমিনার, নীতি-আলোচনা কিংবা তরুণ প্রজন্মভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ খুব সীমিত ছিল। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনসহ তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত বহু সংগঠন সক্রিয় থাকলেও “জিয়া স্টাডিজ” ধরনের শক্তিশালী বৌদ্ধিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি—এটি বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবেও দেখা হয়।
আজকের বাংলাদেশে যখন সুশাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তখন জিয়ার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি আবারও আলোচনায় ফিরে আসে। দুর্নীতিবিরোধী প্রশাসন, গ্রামীণ উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মমুখী শিক্ষা, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি—এসব প্রশ্ন এখনও বাংলাদেশের বাস্তব সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।
জিয়ার ১৯ দফা হয়তো হুবহু বাস্তবায়নের নীতিপত্র নয়, কিন্তু এর ভেতরে যে রাষ্ট্রচিন্তা নিহিত ছিল—তা ছিল উৎপাদনমুখী, জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক এবং রাজনৈতিকভাবে অংশগ্রহণমূলক একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা। আজকের প্রজন্মের কাছে সেই দর্শন নতুন ভাষায়, নতুন বাস্তবতায় ও নতুন রাজনৈতিক কাঠামোয় উপস্থাপন করা বিএনপির জন্য কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়; বরং অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জও।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান এমন এক চরিত্র, যাঁকে শুধু প্রশংসা কিংবা সমালোচনার সরল রেখায় ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি যেমন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম স্থপতি, তেমনি সামরিক শাসনের উত্তরাধিকার নিয়েও বিতর্কের কেন্দ্রে। কিন্তু এটিও সত্য—বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক দিকবদল এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।
৪৫ বছর পরও তাই শহীদ জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন; তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিতর্কের এক স্থায়ী নাম।
লেখক: মোঃ হাফিজ আল আসাদ, সাবেক ছাত্রদল নেতা।
