বিদ্যুৎ খাত এখন অবকাঠামোগত ইস্যু নয়; এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

শেয়ার করুন

সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রীর বক্তব্য—“ঋণে ডুবে থাকার চেয়ে লোডশেডিংয়ের কষ্ট সহ্য করা ভালো”—জনমনে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বক্তব্য কতটা নীতিগতভাবে সঠিক, আর বাস্তবে কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ গত এক দশকে দ্রুত হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করেছে। দ্রুত বিদ্যুতায়ন রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হলেও এর আর্থিক বোঝা এখন প্রকট। ক্যাপাসিটি চার্জ, আমদানি-নির্ভর জ্বালানি এবং ডলারের চাপ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চাপ বেড়েছে। ফলে “ঋণ বনাম লোডশেডিং”—এই দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ কি সত্যিই ‘হয় ঋণ, নয় অন্ধকার’—এই সরল সমীকরণ? নাকি সমস্যার গভীরে রয়েছে পরিকল্পনা, দক্ষতা ও নীতির ঘাটতি?

প্রথমত, বিদ্যুৎ মন্ত্রীর শিক্ষা বা ব্যক্তিগত জ্ঞান নিয়ে বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। নীতি নির্ধারণ একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না; এখানে প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। যদি নীতিনির্ধারণে প্রযুক্তিগত বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়, তাহলে বক্তব্য যতই জনপ্রিয় হোক, দীর্ঘমেয়াদে তা ফলপ্রসূ হয় না।

দ্বিতীয়ত, সিস্টেম লস বা অপচয় কমানো একটি মৌলিক কাজ। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণে প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক ক্ষতি—দুই ধরনেরই সমস্যা রয়েছে। ‘সিস্টেম লস শূন্যে নামিয়ে আনা’ বাস্তবে সম্ভব না হলেও আন্তর্জাতিক মানের ৫-৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল গ্রিড ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ খাতে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব। এতে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাপও কমবে।

তৃতীয়ত, বিলাসী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। বড় শপিংমল, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জায় বিদ্যুৎ অপচয় রোধে নীতিগত নির্দেশনা দরকার। টিয়ারভিত্তিক (slab-based) ট্যারিফ কাঠামো আরও কার্যকর করা যেতে পারে, যাতে অতিরিক্ত ব্যবহারকারীরা উচ্চ হারে বিল পরিশোধ করেন। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমবে।

চতুর্থত, ব্যাটারি চালিত রিকশা ও ছোট যানবাহনের বিদ্যুৎ ব্যবহার একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। এগুলো প্রায়শই অনিয়ন্ত্রিত চার্জিংয়ের মাধ্যমে গ্রিডে চাপ সৃষ্টি করে। শহরভিত্তিক সৌর চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা গেলে, যেমন পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে, গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়বে।
পঞ্চমত, সৌরবিদ্যুৎ শিল্পকে দেশীয় পর্যায়ে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে অধিকাংশ সৌর প্যানেল আমদানি-নির্ভর। দেশীয় উৎপাদন হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দাম কমবে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়বে। ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ (rooftop solar) বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে—বিশেষত নতুন বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে। এতে কেন্দ্রীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমবে।

তবে বিকল্পের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি বহুমুখীকরণ। একদিকে এলএনজি ও আমদানি-নির্ভর জ্বালানি কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে; অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য—যেমন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে গ্রিড সংযোগ—এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

লোডশেডিংকে যদি নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আবার অযাচিত ঋণ নিয়ে অদক্ষ প্রকল্প বাস্তবায়নও আত্মঘাতী। তাই সমাধান ‘একটিকে বেছে নেওয়া’ নয়; বরং দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও বিকল্প জ্বালানির সমন্বিত পথ বেছে নেওয়া।

নীতিগতভাবে সরকারের উচিত তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া—প্রথমত, আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন; দ্বিতীয়ত, সিস্টেম লস ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ; তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ। পাশাপাশি ভর্তুকি কাঠামো এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত সুরক্ষা পায়, কিন্তু অযৌক্তিক সুবিধাভোগীরা নিরুৎসাহিত হয়।
সবশেষে, বিদ্যুৎ খাতের সংকট কেবল প্রযুক্তিগত নয়—এটি শাসন ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন। জনগণ অন্ধকার চায় না, আবার দেউলিয়াও হতে চায় না। তারা চায় পরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও টেকসই সমাধান। সুতরাং ঋণ বনাম লোডশেডিং—এই দ্বৈততার বাইরে এসে একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক জ্বালানি নীতি প্রণয়নই এখন সময়ের দাবি।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত