পররাষ্ট্রের নাজুকতা, জ্বালানি সংকট ও ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা!
মেট্রোরেলের বিস্তৃত প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যে আধুনিকতা, শৃঙ্খলা ও এক ধরনের অভিজাত নাগরিক অভিজ্ঞতার জন্ম হয়, তা নিঃসন্দেহে উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু একই সময়ে যখন জ্বালানি পাম্পে মানুষের দীর্ঘ লাইন, অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ সংকটের বাস্তবতা সামনে আসে, তখন স্পষ্ট হয়—উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি গভীর ব্যবধান রয়ে গেছে।
এই ব্যবধান আজ আরও তীব্র হয়েছে পররাষ্ট্র নীতির দুর্বলতার কারণে। বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি সরবরাহ কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের অপেশাদার কূটনৈতিক অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। যদি এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যেখানে Strait of Hormuz-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তা শুধু একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়—এটি সরাসরি অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর আঘাত।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। International Energy Agency বারবার সতর্ক করেছে, এই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য উভয়ই অস্থির হয়ে ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটে একটি দেশের পররাষ্ট্র নীতিতে সামান্য ভুল বা অসতর্ক বক্তব্যও বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কূটনীতিতে “strategic neutrality” বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় বহুবার উঠে এসেছে—অভ্যন্তরীণ সংকট ও বৈদেশিক নীতির ব্যর্থতা একে অপরকে তীব্রতর করে। Arab Spring-এর সময় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং শাসনব্যবস্থার অদক্ষতা একসঙ্গে কাজ করে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। একইভাবে French Revolution-এর পেছনেও ছিল দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন মানুষ ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত জ্বালানির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন এটি কেবল সরবরাহ সংকট নয়—এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং নীতিনির্ধারণের সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। একটি কার্যকর রাষ্ট্রে জ্বালানি সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত রাখতে বিকল্প উৎস, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগাযোগের বাস্তবতা। “সমস্যা হলে আমাকে ফোন দিন”—এই ধরনের বক্তব্য বাস্তবসম্মত নয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা ঢাকার একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা মাত্র। আধুনিক রাষ্ট্রে সমস্যা সমাধান হয় তথ্যভিত্তিক নীতি, দক্ষ প্রশাসন এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে।
ক্ষমতার কেন্দ্রের চারপাশে একটি বলয় তৈরি হওয়াও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। Niccolò Machiavelli তার The Prince-এ সতর্ক করেছিলেন—যদি শাসকের চারপাশে কেবল প্রশংসাকারী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী থাকে, তবে তিনি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তখন সিদ্ধান্তগুলো হয় একপাক্ষিক, এবং এর ফল ভোগ করে সাধারণ জনগণ।
রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। অভিজ্ঞ ও ত্যাগী কর্মীদের সরিয়ে অদক্ষ বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে সামনে আনা হলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে “elite capture” বলা হয়—যেখানে একটি সীমিত গোষ্ঠী পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং বৃহত্তর স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।
অন্যদিকে, ভিন্নমত বা রাজনৈতিক দলকে হঠাৎ করে নিষিদ্ধ বা দমন করা কোনো রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি, সংলাপ এবং নমনীয়তা অপরিহার্য। কূটনীতির মতো রাজনীতিতেও “negotiation” বা সমঝোতার সংস্কৃতি টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়।
স্বাস্থ্য খাত, জ্বালানি খাত বা অন্যান্য ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রশ্নে অতীত সরকারের ওপর দায় চাপানো একটি সীমিত সময় পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু জনগণ এখন প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ চায়। একটি পূর্ণাঙ্গ “শ্বেতপত্র” প্রকাশ করে অনিয়মের উৎস, প্রক্রিয়া এবং প্রতিকার তুলে ধরা জরুরি। অন্যথায় এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অজুহাত হিসেবেই বিবেচিত হবে।
অতএব, বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক নীতির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। মেট্রোরেলের শৃঙ্খলাবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম যেমন উন্নয়নের প্রতীক, তেমনি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা আমাদের কূটনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য আনার ওপর। অন্যথায় উন্নয়নের দৃশ্যমান কাঠামোর আড়ালে জমে ওঠা সংকট একসময় বৃহত্তর অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে—যা কোনো রাষ্ট্রের জন্যই কাম্য নয়।
মো: হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
