ইলন মাস্কের রকেটের ধাক্কায় চাঁদে ৬০ ফুটের গর্ত হয়ে গিয়েছে!

চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়েছে ইলন মাস্কের সংস্থার রকেট। ছবি: এআই।
শেয়ার করুন

ফ্যালকন-৯-এর ওজন প্রায় চার হাজার কিলোগ্রাম। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই রকেট উৎক্ষেপণ করেছিল স্পেসএক্স। উদ্দেশ্য ছিল দু’টি বাণিজ্যিক লুনার ল্যান্ডারকে ঠিকমতো গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।

ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের রকেট ফ্যালকন-৯ চাঁদে স্থায়ী ভাবে একটি বিরাট গর্ত তৈরি করে ফেলেছে। প্রায় ৬০ ফুট চওড়া সেই গর্ত এখন বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে। গত ৫ অগস্ট রকেটের উপরের অংশটি চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময়ে তার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৫৪০০ মাইল, যা শব্দের গতির চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। বিরল সেই মুহূর্তের সাক্ষী থেকেছে পৃথিবী। অনেক দেশ থেকেই বিজ্ঞানীরা এই সংঘর্ষ পরিদর্শনের জন্য চাঁদের দিকে ক্যামেরা তাক করে বসেছিলেন। গর্তটি বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে, চাঁদের সঙ্গে রকেটের সংঘর্ষের পর কী কী ঘটেছে, তা নিয়েও পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা চলছে।

ফ্যালকন-৯-এর ওজন প্রায় চার হাজার কিলোগ্রাম। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই রকেট উৎক্ষেপণ করেছিল স্পেসএক্স। উদ্দেশ্য ছিল দু’টি বাণিজ্যিক লুনার ল্যান্ডারকে চাঁদের দিকে পাঠানো। সেই কাজ সে সঠিক ভাবেই করে। কিন্তু গোলমাল হয় তার পর। কথা ছিল, রকেটটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সব হিসাব মেলেনি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পরিবর্তে তা পৃথিবীর চারপাশেই ঘুরতে থাকে। চাঁদের কক্ষপথের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছোনো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী কক্ষপথে ছিল মাস্কের রকেটটি। ফলে সংঘর্ষ হয়ে উঠেছিল অনিবার্য।

মহাকাশে ফ্যালকন-৯-এর গতিবিধি পর্যালোচনা করেই চাঁদের মাটিতে এটি আছড়ে পড়ার সম্ভাব্য সময় বিজ্ঞানীরা হিসাব করেছিলেন। ১১-১২ অগস্ট মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার লুনার রিকনাইস্যান্স অরবিটার (এলআরও) চন্দ্রপৃষ্ঠে নতুন গর্তটিকে চিহ্নিত করে। অরবিটারটি ছিল চাঁদের মাটি থেকে প্রায় ৬০ মাইল উঁচুতে। দেখা যায়, ফ্যালকন-৯ চাঁদের মাটিতে ৬০ ফুট চওড়া গর্ত তৈরি করেছে। তার গভীরতা ১০ ফুটের কম। গর্তের একাধিক ছবি বিজ্ঞানীদের হাতে এসেছে। শুধু নাসা নয়, ইউরোপের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা থেকেও চাঁদে রকেটের সংঘর্ষ এবং তার পরবর্তী প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়। ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজ়ার্ভেটরির বিশাল টেলিস্কোপ এই সংঘর্ষের ফলে উদ্ভূত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে লিথিয়াম এবং সোডিয়ামের উপস্থিতি টের পেয়েছে। গর্তটি চিহ্নিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি চন্দ্রপ্রদক্ষিণকারী যন্ত্রও।

নাসার তোলা ছবিতে বিশেষ কিছু দৃশ্য ধরা পড়েছে। তাতে রয়েছে বিস্ফোরণের ইঙ্গিতও। দেখা গিয়েছে, ফ্যালকন-৯-এর ধাক্কায় চাঁদে তৈরি হওয়া গর্তের কিনারা থেকে উজ্জ্বল রশ্মির মতো রেখা ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, রকেটটি চাঁদের বুকে আঘাত করায় চন্দ্রপৃষ্ঠের অনেক গভীর থেকে উপাদান ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। সেই সমস্ত চন্দ্রগর্ভস্থ পদার্থই এই রশ্মির উৎস, মত বিশেষজ্ঞদের। তবে তা আরও ভাল করে পর্যবেক্ষণ করা দরকার বলে মনে করেন তাঁরা।

চাঁদে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে চন্দ্রপৃষ্ঠে কোনও দাগ তৈরি হলে তা মুছে যায় না। প্রায় ৫০ বছর আগে চাঁদে নাসার অ্যাপোলো অভিযানের চিহ্ন আজও রয়ে গিয়েছে। বড় কিছু না ঘটলে আগামী আরও হাজার বছর তা থেকে যাবে। একই ভাবে থেকে যাবে ফ্যালকন-৯-এর ধাক্কায় তৈরি গর্তটিও।

চাঁদে মাস্কের সংস্থার রকেটের আঘাত এবং বিস্ফোরণে পৃথিবীর তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠে গিয়েছে মহাকাশ-বর্জ্য ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। মহাকাশ নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা, অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা। তার ফলে ছোটবড় অনেক পরিত্যক্ত পদার্থই মহাকাশে থেকে যাচ্ছে। তা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে না বা যাচ্ছে না। এ নিয়ে কোনও আইনকানুনও তৈরি হয়নি। বিজ্ঞানীদের একাংশের মত, এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। মহাকাশ-বর্জ্যের পরিমাণে রাশ না টানলে আগামী দিনে মানুষের অভিযানের পথেই তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ক্ষতি হতে পারে ভবিষ্যতের যে কোনও গবেষণায়।

মহাকাশের পাথরখণ্ড কিংবা পৃথিবীর বর্জ্য পর্যবেক্ষণ করে নাসার সেন্টার ফর নিয়ার আর্থ অবজেক্ট স্টাডিজ় এবং আমেরিকার মহাকাশ নজরদারি নেটওয়ার্ক। বড় বড় পাথর বা গ্রহাণু চোখে পড়লেও অনেক বর্জ্যই বিজ্ঞানীদের নজরের আড়ালে থেকে যায়। তা নিয়ে চিন্তা বাড়িয়ে দিল স্পেসএক্সের রকেটের ধ্বংসাবশেষ।

আনন্দবাজার পত্রিকা।


শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত